• বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ০৭:১৪ পূর্বাহ্ন
  • English Version
Notice :
***শর্ত সাপেক্ষে সাংবাদিক নিয়োগ দিচ্ছে সংবাদ২৪**আগ্রহীরা সিভি পাঠান এই ইমেইলেঃinfo@shangbad24.com

করোনার অজুহাতে নৈরাজ্যে মেতেছে গণ পরিবহণ!

খালিদ হাসান
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২০

করোনাকালীণ সময়ে স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ব। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে থাকা বাংলাদেশেও এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ইতোমধ্যই খোলা হয়েছে হাট বাজার, ব্যাংক ও সরকারি অফিস । দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর বেশ কিছু শর্ত সাপেক্ষে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছে গণ পরিবহণ। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলে তুলনামূলক কম যাত্রী পরিবহনের প্রশ্নে প্রচলিত ভাড়ার উপর ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি করে প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে গত মে মাসের ৩১ তারিখে।

প্রজ্ঞাপন জারির শুরুর দিকে গণ পরিবহণ গুলো নিয়ম মেনে যাত্রী পরিবহণ করলেও কিছুদিন পরেই পাল্টে যায় চিত্র। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই নিজেদের ইচ্ছা মতো ভাড়া আদায় ও যাত্রী পরিবহণ করা হচ্ছে বাস গুলোতে। এতে করে চরম নৈরাজ্যর সৃষ্টি হয়েছে গণপরিবহনে। যাত্রীরা পড়েছেন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে কম যাত্রী তুলতে হবে বলে মালিকদের ক্ষতি পোষাতে আন্ত:জেলা ও দূরপাল্লা এবং নগর পরিবহনের বাস ও মিনিবাসের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছে সরকার। যদিও প্রথমে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ বাস ভাড়া ৮০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করলেও তা নিয়ে আপত্তি করেছিল ভোক্তা ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো।

শেষ পর্যন্ত ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে ৩১ মে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, “কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে শর্তসাপেক্ষে সীমিত পরিসরে নির্দিষ্ট সংখ্যাক যাত্রী নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে আন্ত:জেলা ও দূরপাল্লার চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের ভাড়া পুনঃনির্ধারণ করা হল।

প্রজ্ঞাপনে ভাড়া বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বেশ কিছু শর্ত উল্লেখ করা হয়। এরমধ্য রয়েছে:

>> একজন যাত্রীকে বাস/মিনিবাসের পাশাপাশি দুইটি আসনের একটি আসনে বসিয়ে অন্য আসনটি অবশ্যই ফাঁকা রাখতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসারে শারীরিক ও সামাজিক দূরুত্ব বজার রাখতে হবে। কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটে উল্লেখিত মোট আসন সংখ্যার অর্ধেকের বেশি যাত্রী বহন করা যাবে না এবং দাড়িয়ে কোনো যাত্রী বহন করা যাবে না।

>> বিদ্যমান হারে প্রচলিত ভাড়ার চার্টে যে ভাড়া আছে, তার সঙ্গে এবারের বৃদ্ধির হার যোগ করে নতুন ভাড়া নির্ধারিত হবে।

>> স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করে বাস ও মিনিবাস চালাতে হবে।

>> অনুমোদিত ভাড়ার হার করোনাভাইরাসের এই সংকটের সময়ই প্রযোজ্য হবে। এ সংকট কেটে গেলে আগের ভাড়ার হার প্রযোজ্য হবে।

কিন্তু দু:খ জনক হলেও সত্য যে, প্রজ্ঞাপনে জারি করা বিশেষ বিশেষ শর্তের কোনটিই মানা হচ্ছেনা গণ পরিবহনে। করোনা কালে একজন যাত্রীকে বাস/মিনিবাসের পাশাপাশি দুইটি আসনের একটি আসনে বসিয়ে অন্য আসনটি ফাঁকা রাখার শর্ত এখন যেনো ভুলেই গেছেন গণ পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি আসন গুলোতে আগের মতোই দুইজন করে যাত্রী বসানো হচ্ছে। ডাবল ভাড়া দিয়ে ডাবল সিটে দুজন যাবো কেন? এমন প্রশ্ন করে কেউ প্রতিবাদ করলে তার উপর চড়াও হচ্ছেন পরিবহণ শ্রমিকরা।

এদিকে স্বাস্থ্যবিধি অনুসারে শারীরিক ও সামাজিক দূরুত্ব বজার রেখে মোট আসন সংখ্যার অর্ধেকের বেশি যাত্রী বহন করা যাবে না এবং দাড়িয়ে কোনো যাত্রী বহন করা যাবে না মর্মে প্রজ্ঞাপনে শর্তারোপ করা হলেও মহাসড়কে চলাচল কারী আন্ত:জেলা ও দূর পাল্লার বাস গুলোতে উপচে পড়া ভির লক্ষ করা যাচ্ছে। অধিকাংশ চালক ও সহকারী মাস্ক ব্যবহার করছেন না। যাত্রী ওঠা নামার সময় হ্যান্ড সেনিটাইজার ছিটানোর কোন বালাই নেই।

এমনিতেই সাধারণ মানুষ আর্থিক দুরবস্থায় রয়েছে, তার ওপর এই অতিরিক্ত ভাড়া যাত্রীদের কাছে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। দুই মাস বন্ধ থাকার লোকসান পোষাতে বাস কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে রীতিমতো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পরিবহন শ্রমিক ও কনডাক্টরদের সঙ্গে যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি ও ভাড়া নিয়ে বাকবিতন্ডা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়তই।

এদিকে করোনা সংকটে গণপরিবহনে ৬০ শতাংশ বর্ধিত বাসভাড়া অবিলম্বে প্রত্যাহার করে আগের ভাড়া বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি। চলতি মাসের ১১ তারিখে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, করোনা সংকট রয়ে গেলেও দেশে এখন কোনো গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। যেসব শর্ত অনুসরণ করে বর্ধিত ভাড়া আদায়ের কথা বলা হয়েছিল, তার কোনোটাই মানা হচ্ছে না বাসগুলোতে। সেই পুরনো কায়দায় গাদাগাদি করে যাত্রী বহন করা হচ্ছে। আবার এই করোনাকালে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য সরকারের বর্ধিত ৬০ শতাংশ ভাড়ার চেয়েও অধিকাংশ রুটে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এতে করোনা সংকটে কর্মহীন ও আয় কমে যাওয়া দেশের সাধারণ মানুষের যাতায়াত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার কয়েকদিন আগে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কিছু কিছু লোকাল বাস অতিরিক্ত যাত্রী নিচ্ছে, ভাড়া বেশি নিচ্ছে- এ অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের ধরতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে ম্যাজিস্ট্রেট-স্বল্পতায় সারাদেশে সমানভাবে অভিযান চালানো যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে অভিযান চালাতে।

এদিকে করোনার কারণে বাড়ানো ভাড়া প্রত্যাহারের বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেছেন, সরকারের সিদ্ধান্ত ছাড়া বাসে অর্ধেক আসন খালি রাখার শর্ত তুলে নেওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া বাড়তি ভাড়া কমানোও যাবে না।

তাহলে দেশের পরিবহণ খাতের এই যখন অবস্থা তখন সাধারণ যাত্রীরা প্রশ্ন তুলেছেন, করোনাকালে অর্ধেক আসন খালি রাখার শর্তে ভাড়া বেড়েছিল; কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে কোনো সিটই খালি নেই। তাহলে বাড়তি ভাড়ার পক্ষে যুক্তি কী?
তাই আমি মনে করি পরিবহণ সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবিতে পরিনত হয়েছে। জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের পূর্ণ বাস্তবায়ন অথবা পূর্বের নিয়ম বহাল রাখাই হতে পারে এর সমাধান। তবে করোনা কালে আগের মতো গনপরিবহনে গাদাগাদি করে যাত্রি পরিবহণ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলতে পারে নাগরিকদের। তাই প্রজ্ঞাপনের নিয়ম মেনে গণ পরিবহন চলচলে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এখনি। সেই সাথে বাড়াতে হবে নজরদারি। পরিবহণ কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন ও সাধারণ যাত্রী সকলের প্রচেষ্টায় আসতে পারে সমস্যার সুন্দর একটি সমাধান।#

মো. খালিদ হাসান
সংবাদকর্মী ও কলামিষ্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ