• সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:২৭ অপরাহ্ন
  • English Version
Notice :
***শর্ত সাপেক্ষে সাংবাদিক নিয়োগ দিচ্ছে সংবাদ২৪**আগ্রহীরা সিভি পাঠান এই ইমেইলেঃinfo@shangbad24.com

গোড়ায় গন্ডগোল (পর্বঃ০৩)

লেখক-মোঃসারোয়ার হোসেন(হাবীব)
আপডেট রবিবার, ৭ জুন, ২০২০

ড.রহমান এখন তার চেম্বারে বসে আছেন। পরিবারের ভেতর কেউ ডক্টর হলেই চেনাজানা সূত্রে অনেকেই আসে চিকিৎসা করাতে। এটা শুধু ডক্টরদের জন্যই নয়। আর্টিষ্ট,কবি বা ফটোগ্রাফারের ক্ষেত্রেও তাই। ধরুন আপনার চেনাজানা কেউ একজন আর্টিস্ট। আপনার ছবি আঁকানোর প্রয়োজন পড়লেই আপনি তার স্বরণাপন্ন হবেন। আবার ধরুন আপনার কোনো ছবি তোলার সখ হলো তখন আপনি চলে গেলেন আপনার চেনাজানা সেই ফটোগ্রাফারের কাছে। ডক্টর রহমান তার ডক্টর জীবনে সবগুলো বিরক্তিময় বিষয়গুলো পার করে এসেছেন। এখন পরিচিতদের বিনা ভিজিটেই চিকিৎসা করা কমন ব্যাপার হয়ে গেছে। এইতো একটু আগেই তিনি একজনকে প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন। লোকটা তার গ্রামের বাড়ি থেকে আসা প্রতিবেশি চাচা। দির্ঘদিন যাবৎ তাকে ডায়াবেটিকস্ এর ইনসুলিন গ্রহণ করতে হচ্ছে। ডক্টর রহমানের এখন নিজের গ্রামের কথা মনে পড়তেছে। একসময় এই চাচাই তাকে ছোটবেলায় কাঁচা মিঠে আম পেড়ে খাওয়াতো মিন্টুদের বাগান থেকে। বৃদ্ধ চাচার সেই ঘটনাগুলো মনে আছে কিনা কে জানে? ডক্টর রহমানের ছোটবেলার কিছু কিছু স্মৃতি এখনো স্পষ্ট মনে আছে। সবারই ছোটবেলার কিছু না কিছু স্মৃতি ফ্রেমে বাঁধানো ছবির মতো আটকে থাকে। যার কোনোই পরিবর্তন হয়না এমনকি স্মৃতিগুলোর কখনো বয়সও বাড়েনা। এ জন্যই বোধয় স্মৃতিরা হয় চির অমর। ডক্টর রহমান যখন তার ছোটবেলার কথা মনে করেন তখন তিনি নিজেকে তার সেই ছোট অবস্থাতেই দেখেন। তার স্মৃতিতে তিনি ৫/৬ বছরের শিশু হয়েই আছেন। ডক্টর রহমান তার বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য চাচাকে জোরাজুরি করলেন কিন্তু চাচার নাকি খুব কাজ বাড়িতে। ডক্টর রহমানও আর তেমন জোর করলেন না। রেহেনা বাসায় থাকলে না হয় একরকম কথা ছিলো,ভালোমন্দ রান্না করে খাওয়াতে পারতো।
ডক্টর রহমান চেম্বার থেকে বেরোবার জন্য মনস্থির করলেন। তখনই সাদাপাঁকা দাড়িভর্তি এক লোক একগাল হাসি ভরা মুখ নিয়ে চেম্বারে ঢুকলেন। লোকটার নাম রানা। ডক্টর রহমানের হাইস্কুল ফ্রেন্ড। একসঙ্গে তারা প্রায় পাঁচ বছর স্কুল জীবন পার করেছেন। রানা ডক্টর রহমানের চেম্বারে ঢুকেই একপাটি দাঁত বের করে ডক্টর রহমানকে জিজ্ঞেস করলেন,
-কি রে কেমন আছিস? আমি তো ভাবতেই পারিনি তোকে এখানে পাবো। বাহিরে অবশ্য সাইনবোর্ডে তোর নাম দেখলাম। পরে মনে হলো তুই আশেপাশেই কোনো একটা জায়গাতেই থাকিস শুনেছিলাম এ জন্য নিশ্চিত হতে চেম্বারে ঢুকে পড়লাম।
ডক্টর রহমান অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসি হাসি মুখ করে গল্প করতে লাগলেন। রানা যে অতিরিক্ত পান খাদক তা তার লাল লাল দাঁত দেখেই বোঝা যাচ্ছে। গা থেকে আবার ভুরভুর করে জর্দার গন্ধ ছড়াচ্ছে।
ডক্টর রহমান টিভিতে হিন্দি একটা ভৌতিক সো দেখেছিলেন যেখানে ভ্যাম্পায়ার জাতীয় প্রাণী মানুষের রক্ত খেয়ে বেড়ায়। যেহেতু সো টা পরোটায় কাল্পনিক সেহেতু রক্ত চোষা বাদুরটা যখন রক্ত খেয়ে মানুষের রুপ ধারণ করে লাল লাল রক্তমাখা দাঁত কেলিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকায়,রানাকে এখন ঠিক তেমনটায় দেখতে লাগছে। ডক্টর রহমানকে চুপ থাকতে দেখে রানা আবার বললো,
-তারপর বল,কোথায় উঠেছিস? বাসা সাবলেট নিয়েছিস নাকি নিজের বাড়ি করেছিস?
-অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে নিজের স্থায়ী একটা বাসা বানিয়েছি। সময় করে বেড়াতে আসিস,চায়ের নেমন্ত্রণ…
-তুই তো সেই আগের মতো কিপ্টাই আছিস দেখছি। এতোদিন পর দাওয়াত দিলি তাও শুধুমাত্র চায়ের নেমন্ত্রণ! আমি গেলে তো তোর বউয়ের হাতের খাসির মাংস খাবো…
-তাহলে তোকে বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। সে এখন বাপের বাড়ি আছে। যদি মান ভাঙ্গে তাহলে তোর ভাগ্যে খাসির মাংস জুটবে,নয়তো জুটবেনা। তবে আমার মেয়ে রুপা খাসির মাংস রান্নাকরতে না পারলেও মুরগীভাজা করতে ভালো পারে। তোকে মুরগী ভাজা খাওয়ার দাওয়াত রইলো…
-মুরগী ভাজা? এটা আবার কেমন খাবার?
-বাংলায় বললাম বুঝলিনা। মুরগী ভাজা না বুঝলে চিকেন ফ্রাই বুঝিস তো?
-ও,হা হা হা তাই বল! আরে আমরা তো ট্রিপিক্যাল বাঙ্গালি তাই অন্যদেশের ভাষার প্রতি আগ্রহটা একটু বেশিই। মাছ ভাজাকে আমরা বলি ফিস ফ্রাই,শুনে মনে হয় না জানি এটা কতো উন্নত মানের খাবার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে গ্রামের দশবছরের বাচ্চা মেয়েও এটা রান্না করতে পারে।
-এই নে,এটা আমার বাসার ঠিকানা। সময় করে গল্প করা যাবে,এখন আমাকে উঠতে হবে।
ডক্টর রহমান মিষ্টার রানার হাতে বাসার ঠিকানা গুজে দিয়ে উঠে পড়লেন। মিষ্টার রানা অবাক দৃষ্টিতে ডক্টর রহমানের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

রুপা প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে দারিয়ে আছে ইলেকট্রিশিয়ান ছেলেটা একটু পর পর তার দিকে তাকাচ্ছে। রুপার তা একটু্ও খারাপ লাগছে না। বেশি বেয়াদবি করলে কষে একটা থাপ্পড় লাগানো যাবে। রুপা এখন ছেলেটাকে থাপ্পড় দেওয়ার কল্পনা করছে,
-শয়তান হতচ্ছাড়া,চোখ নামিয়ে কাজ করবি এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। কু নজরে তাকাবি তো চোখ গলিয়ে বের করে কুত্তারে খাওয়াবো। এই বলেই রুপা ছেলেটার গালে চড় বসালো। ছেলেটা গালে হাত দিয়ে দাড়িয়ে রইলো।
-আসলে আপা,আমি আপনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি…
রুপা আবারো ছেলেটার গালে চড় বসালো,
-হাবুডুবু খাচ্ছিস কেনো? সাঁতার জানিস না? সাঁতার না জানলে জলে নামিস কেনো?
-তাহলে কি আপনি আমার প্রপোজাল একসেপ্ট করেছেন?
-ঝুলিয়ে রাখলাম,প্রপোজটা লম্বা হোক। আর আমি কি তোর মতো ছ্যাঁচড়াকে ভালোবাসবো নাকি! আমার মতো মেয়ে একমাত্র হাসিবদের মতো ছেলেদের প্রেমেই পড়বে। আমি হাসিবকে খুব ভালোবাসি।
-হাসিব কে? সে কি আমাদের গল্পের ভিলেন নাকি!
-ভিলেন হবে কেনো? সে ই হিরো,তোর মতো ছেলেরা পাবে সাইড রোল।
-কি এমন আছে হাসিবের মাঝে? আমার কাছে টাকা আছে,কর্ম আছে। হাসিবতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশানি করায়। তোমাকে সময় দিতে পারবেনা।
-তার মাঝে ভালোবাসা আছে,আমার সুখ আছে। না পারুক আমায় সময় দিতে,আমি অপেক্ষায় থাকবো,সারাদিন না হোক,সন্ধ্যেতে তো ঘরছাড়া পাখিরাও নীড়ে ফিরে আসে সেও ফিরে আসবে আমার তাতেই জনমভর সুখ…
-এতোটা ভালোবাসেন তারে? তার জন্য জীবন দিতে পারবেন?
রুপা এ পর্যায়ে আবারো ছেলেটাকে থাপ্পড় দিলো,
-ভালোবেসেছি একসাথে বাঁচার জন্য,আমি মরলে তাকে ভালোবাসবে কে?
-বাহ্! খুব তো সাহিত্যিক কথা বলতেছেন,দেখবেন যেদিন অভাব জানালা দিয়ে ঢুকবে সেদিন ভালোবাসা চাল ফুঁটো করে বেরিয়ে যাবে।
হঠাৎ ফ্যানের বাতাস পেয়ে এ পর্যায়ে রুপার কল্পনার ঘোর কাটলো। এতোক্ষণে ইলেকট্রিশিয়ান ছেলেটা ফ্যানের লাইন ঠিক করে দিয়েছে। ছেলেটার সাথে ফজলু নামের একটা ছোট ছেলেও এসেছে। যন্ত্রপাতি হাতে হাতে এগিয়ে দেওয়াই তার কাজ।
টুম্পার আজ বেশ মন খারাপ। ফ্যানের বাহানাতে সে আর যখন তখন রুপার ঘরে যেতে পারবেনা। তার সাথে আর গল্প করাটাও হবেনা। যারা বাঁচাল প্রকৃতির হয় তাদের কাছে কথা বলার সুযোগ না পাওয়াটাও একটা না পাওয়া। আফার প্রেমিকের সম্পর্কে অনেক কিছু জানার ইচ্ছা ছিলো টুম্পার। সে সুযোগটা আপাতত বন্ধ।
ইলেকট্রিশিয়ান ছেলেটা ফজলুর হাত থেকে প্লায়ার্স নিতে নিতে আরেকপলক রুপাকে দেখে নিলো। অন্যসময় হলে রুপা অন্যঘরে চলে যেতো। তারও এখন শেষ অবধি ছেলেটা কি করে তা দেখার বড্ড ইচ্ছে। রুপা এবার মনে মনে ঠিক করলো এ বার যখন ছেলেটা তার দিকে তাকাবে তখন সে ছোট করে একটা চোখ মারবে। লোহা গরম থাকতে থাকতে তাতে ঘাঁ দিতে হয়। ছেলেটা যদি তার চোখ মারা দেখে অসভ্য ইঙ্গিত করে তখনিই তাকে ইচ্ছামতো থাপ্রানো যাবে।
ছেলেটা তার কাজ শেষে করে দু’তিনবার সুইচ টিপে নিশ্চিত হলো যে লাইটটা ঠিক আছে। রুপা খানিকটা অবাক হলো কারণ চোখ মারার পরেই ছেলেটার আরো উৎসাহ পাওয়ার কথা কিন্তু সে আর একবারের জন্যও তার দিকে তাকাইনি। সে কি লজ্জা পেয়েছে? নাহ্! লজ্জা পেলে তো প্রথম থেকেই লজ্জা পেতো।
-কতো টাকা দিতে হবে?
-পাঁচশত দেন।
-খাবেন কিছু? নাস্তা দেবো?
এ বার আবার ছেলেটা রুপার দিকে তাকালো। তার চোখ ছলছল করছে। হয়তো কারোর কথা মনে পড়েছে। সে কি মা হারা? খাবারের সাথে একমাত্র মায়েরই যোগসুত্র থাকে কেননা প্রতিটা মা ই পরম যত্নে সন্তানদেরকে নিজে হাতে তুলে খাওয়ান। চোখের পানিটা রুপার কাছে খুব বিরক্তিকর ব্যাপার। রুপা টুম্পাকে নাস্তা আনতে বললো। নাস্তা খাওয়ার ফাঁকে রুপা ছেলেটার সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলো তার নাম সজীব। তার ছোট বোন বেঁচে থাকলে রুপার বয়সিই হতো। প্রায় দু বছর হলো সড়ক দুর্ঘটনায় তার বোন মারা যায়। তার বোন তাকে মাঝে মাঝেই নিজর হাতে তুলে খাওয়াতো। তার বোনের নাম অধরা।

ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় রুপার ফোনে অপরিচিত নাম্বার থেকে একটা কল এলো। দু’বার রিং হওয়ার পর রুপা রিসিভ করলো,
-হ্যালো…
-রুপা বলছো?
-হুম,আপনাকে তো চিনলাম না।
-এতোসুন্দর একটা চিঠি দিলে যার সাথে নাম্বারটাও দিলে আবার চিঠিতে বাসার সামনে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষাও করতে বললে আর আমাকেই চিনতেছোনা? আমি এতোক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু তোমার বাসার সামনেই অপেক্ষা করছি। হ্যাঁ,মাত্র দুই বার উঠেছিলাম,একবার ইয়ে পেয়েছিলো আরেকবার সিগারেট খেতে গেছি। কারোর বাসার সামনে সিগারেট ধরাতে নেই এটা সাধারণ ভদ্রতা…
রুপা সঙ্গে সঙ্গে জানালা খুলে নিচে উকি দিলো। হ্যাঁ সত্যি সত্যিই তো কেউ একজন দারিয়ে আছে। মুখটা পরিচিত লাগছে কিন্তু মনে করতে পারতেছেনা,সে রুপাকে জানালায় দেখে হাত নারিয়ে সারা দিলো।
-আপনি কে বলুন তো!
-আমাকে চিনতে পারছোনা? আমি রাসেল। আমি ভাবতেই পারিনি তুমি এভাবে আমাকে সারপ্রাইজ দিবে। একসময় তোমাকে কতোইনা প্রপোজ করেছি কিন্তু তুমি তো একসেপ্ট করোনি আজ হঠাৎ মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি আমার যে কি ভালো লাগছে তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারবোনা,একটু নিচে আসবে প্লিজ…
রুপা খট করে জানালা বন্ধ করে থম মেরে দারিয়ে রইলো। রাসেল ছেলেটা মাঝে মাঝে তাকে ইমপ্রেস করার জন্য নিচে ঘুরঘুর করতো। কিন্তু চিঠি পাঠানোর সময় তো টুম্পাকে হাসিবের চেহারার বর্ণনাও দিয়েছিলাম। গন্ডগোলটা টুম্পাই বাধিয়েছে। অনর্থক এই পাগলটার সাথে কথা বলার কোনো অর্থই হয়না। এমনিতেই জলন্ত আগুন তার উপর আবার ঘি ঢেলেছি। রুপা সব সময়ই চেয়েছে তার প্রেমটা যন্ত্রমুক্ত থাকুক। যোগাযোগটা চিরকুটের মাধ্যমে হোক। লুকিয়ে লুকিয়ে চিঠি পড়ার মাঝে অন্যরকম একটা তৃপ্তি আছে। কিন্তু আজ যে হঠাৎ তার কি হলো হাসিবকে সে তার ফোন নাম্বার দিয়ে চিঠি লিখে পাঠালো টুম্পার হাতে আর চিঠিটা হাসিবের কাছে না গিয়ে রাসেল নামের ছেলেটার হাতে পৌছে গেছে। টুম্পা এখন ভ্যাবলার মতো রুপার দিকে তাকিয়ে আছে।
-কি রে খুব তো বড় বড় গল্প করেছিলি,খুব নাকি নিজে দায়িত্ব নিয়ে ঠিক লোকের হাতে চিঠি পৌছে দিয়েছিস! তাহলে চিঠিটা বদমায়েশ রাসেলের হাতে পৌছালো কেমনে?
-আফা,আপনে যেমনডা কইছেন তেমনডাই তো করছি। ছেলেটা তো হলুদ পাঞ্জাবি পড়াই ছিলো। হাতে হাত ঘড়িও ছিলো তবে আপনার কথা মতো শুধু চুলডা উসকো খুশকো আছিলো না। খুব সুন্দর করে ঐ যে কি একটা ফ্যাশন বেরোইছেনা ও হ জেল দিয়ে খাড়া করানো ছিলো।
রুপা টুম্পাকে কি বলবে ভেবে পাচ্ছেনা। যে ছেলে অন্য মেয়েকে ইমপ্রেস করতে চায় সে তো সবসময় ফিটফাট হয়েই সামনে ঘুরঘুর করবে এটা তো স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু,কাকতালীয় ভাবে পাঞ্জাবির রংটা যে এভাবে মিলে যাবে এটা রুপা কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। এদিকে রাসেল ছেলেটা বার বার রুপাকে কল করেই যাচ্ছে যা রুপার কাছে এখন সবচেয়ে বেশি বিরক্তিকর বিষয়। রাসেল ছেলেটাকে এখন খুব খারাপ ভাষায় গালি দিতে পারলে শান্তি হতো। কিন্তু রুপার মুখে কোনো গালি আসতেছেনা। দাদি থাকলে নিশ্চয় বলতো,
-সালা ইতোরের বাচ্চা,আর যদি ফোন দিসোচ তো তোর বিচির হালুয়া বানায়া খামো।
রুপার দাদির নাম রুজিনা বেগম। গ্রামের বাড়ি বগুড়া। বুড়িটা সাংঘাতিক রকমের খারাপ কথা জানে। দাদির কথা মনে পড়তেই রুপার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। বুড়িটা অনেকদিন হলো এ বাড়িতে আসে না। মায়ের অনুপস্থিতির কথা শুনিয়ে খুব সহজেই তাকে এ বাড়িতে আনা যায়। শুধু বাবার অনুমতি দরকার। বাবা দাদিকে একদমই সহ্য করতে পারেন না। দু মিনিট একসঙ্গে থাকলেই দুজনে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। এর জন্য দুটি কারণ আছে,প্রথমটা হলো তার এই বাজে ভাষা আর দ্বিতীয়টা হলো বুড়ি যখন তখন তার ভাঙ্গা ক্যাসেড চালু করেন। আসলে বুড়িটা বড্ড প্যাঁচাল পাড়ে। হয়তো দেখা যাবে রাত দু টায় ঘুম ভেঙ্গেছে তখন বুড়ির মনে পড়বে কাকে কাছে পাইলে কি বলে গালি দিতো,কে বুড়ির সাথে অন্যায় করেছে কে তাকে সাহায্য করেছে এছাড়াও নানা রকম শাপ শাপান্তরও করেন তিনি। এমনকি নামাজে বসেও মাঝে মাঝে বির বির করে কাউকে গালি দেন। দুর থেকে যদি মনে করেন বুড়ি খুব সুন্দর তসবি গুনতেছে কিন্তু কাছে গেলেই আপনার ভুলটা ভেঙ্গে যাবে।
আজ বৃহঃস্পতিবার
মন্টু ফকির আজকের দিনেই সকলের সমস্যার কথা শোনেন। ছোট্ট একটা ঝুপড়িমতো ঘরে তিনি বসেন। আজ তার উঠোনে বিরাট লাইন। কেউ ধান,কেউ চাল অথবা কেউ গৃহপালিত মোরগ এনেছেন মন্টু ফকিরের জন্য।
মন্টু ফকিরের বউ তিনদিন আগেই তার সাথে ঝগড়া করে বাপের বাড়ি চলে গেছেন। যে নিজের ঘরই বাঁচাতে পারেনা সে আর অন্যের ঘর কিভাবে বাঁচাবে? এ সব প্রশ্ন এখানকার ভক্ত শ্রেণির লোকেদের মাথায় কেনো আসেনা তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। ফকিরের জন্য এটা ভালো। না হলে তো তার ধান্দা বন্ধ হয়ে যেতো। রেহেনা বেগমের এ সবে কোনোদিন বিশ্বাস নেই। এ যুগে পীর ফকির সব ভূয়া সবাই ভন্ড। ভোজবাজি ভেলকিবাজি করে পয়সা কামায়। সবাই জানে সে লোকঠকানোর ব্যাবসা করে অথচ লোকজনরাও এখানে ঠকতেই আসে। একবার দু বার না,বার বার আসে। এরা কথার প্যাঁচে জরায়ে আপনাকে আষ্টপিষ্টে বেঁধে রাখবে। আসলে এখন পৃথিবীতে মিথ্যাদিয়ে জমজমাট ব্যাবসা চলে। আর মিথ্যার জগতে সত্যের কোনো স্থান নেই। সত্য কখনো প্রমান করতে হয়না। মিথ্যাকে সত্য করার জন্য প্রমানের প্রয়োজন হয়। রেহেনা বেগম এসব মিথ্যা বুজরুকিতে একমাত্র তার মায়ের কারণেই এসেছেন।
মন্টু ফকির খুব ঘটা করে চোখ বন্ধ করে বিরবির করছেন তারপর পানিতে ফু দিচ্ছেন। সেই পানি বোতলে ভরে ভরে লোকজন নিয়ে যাচ্ছে। আবার কিছু কিছু টোটকা তিনি সুতাতে গিট পাকিয়ে মালা বানিয়েও দিচ্ছেন। মুনজিরা বেগম একটা বেতের মোড়ায় বসেছেন। রেহেনাকে মন্টু ফকিরের সামনে পাটিতে বসানো হয়েছে। আচ্ছা! রেহেনা বেগম কি অসুস্থ? তিনি নিজে তো অসুস্থ না,তিনি এসেছেন নিজের স্বামির সমস্যা নিয়ে। তাহলে তিনি অন্যসব রুগিদের মতো পাটিতে বসলেন কেনো। উঠে পড়বেন নাকি বসে থাকবেন এটা ভাবতে ভাবতেই মন্টু ফকির জিজ্ঞেস করলো-নাম কি?
-সমস্যা আমার না,সমস্যা আমার স্বামীর। তিনি অন্য নারীতে আসক্ত। তার মেয়ের বয়সি নার্সের সাথে তার ইটিস্ পিটিস্ চলছে। কি করলে ভালো হয় সে ব্যাবস্থা করেন। আমার মনে হচ্ছে তাকে ঐ মেয়েটা তুক তাক করেছে। তাকে সত্যিই তুক করা হয়েছে কিনা তা কি জানা যাবে?
-যাবেনা কেনো অবশ্যই জানা যাবে। রুগীর নাম কি?.
-ডক্টর রহমান
-বাবার নাম?
-আকবার ব্যাপারি।
-আপনার নাম কি?
-আমার নাম কি জন্য দরকার।
-আমার ফকিরন্তি যে মিথ্যা না এটা পরিক্ষা করার জন্য। আপনাকে তো আর বশ করা হয়নি। এই দুই চিরকুটে থাকবে দু জনের নাম তারপর আমি আমার দোয়া পড়া পানিতে ফেলবো যদি এই দুই নামের মধ্যে কাউকে তুক করা হয় তালে যাকে তুক করা হবে তার নামটা ভেসে বেড়াবে আর যদি তুক করা না থাকে তাহলে দুটো চিরকুট ই ডুবে যাবে।
এই বলেই মন্টু ফকির নাম লেখা দুটি কাগজ ফেলে দিলেন দোয়া পড়া পানিতে। রেহেনা বেগমের নামটা ডুবে গেলো আর ডক্টর রহমানের নামটা ভেসে থাকলো পানির ওপর। রেহেনা বেগম বিষ্মিত হয়ে গেছেন। শেষমেষ তার স্বামিকে সত্যি সত্যিই তুক করা হয়েছে! রেহেনা বেগম এ বার আচলে চোখ মুছে বললেন,
-বাবা,ওকে ভালো করার কি আর কোনোই উপায় নাই? আমার সংসারটা তো ভেঙ্গে যাবে…
-হুম সমস্যা একটু জটিল,দুই হাজার টাকা হাদিয়া লাগবে…
মুনজিরা বেগম পান মুখে দিয়ে বললেন,
-যদি কাজ হয় দু হাজারের বেশিই দেবো,কাজটা আগে হওয়া চাই…
-উনার স্বামিকে কি এখানে আনা সম্ভব?
-না, সে এমন জায়গায় আসবে কেনো? সে তো নিজেই জানেনা যে সে সমস্যার মধ্যে আছে। পাগল কি কখনো নিজে মানতে চায় যে সে পাগল? একমাত্র সেই ভাবে সে ছাড়া বাকি সবাই পাগল। বিকল্প কিছু কাজ থাকলে করতে দেন।
মন্টু ফকির একটু মাথা চুলকালেন তারপর খুব মনোযোগ দিয়ে কি যেনো পড়তে লাগলেন আর একটা সাদা সুতায় গিট দেওয়া শুরু করলেন। সুতাটা রেহেনা বেগমের স্বামি যে বালিশে ঘুমায় তার নিচে রাখতে হবে। ইনশাল্লাহ সাত দিনের মাঝেই সমস্যার সমাধান হবে।
এখন এই পড়া সুতাটা তার স্বামির বালিশের নিচে রাখার জন্য হলেও তাকে এবার তার স্বামির বাড়ি ফিরে যেতেই হবে।
(চলবে…)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ