• বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:১৮ অপরাহ্ন
  • English Version
Notice :
***শর্ত সাপেক্ষে সাংবাদিক নিয়োগ দিচ্ছে সংবাদ২৪**আগ্রহীরা সিভি পাঠান এই ইমেইলেঃinfo@shangbad24.com

চাঁদনী পসর (পর্বঃ০১)

মোঃসারোয়ার হোসেন(হাবীব)
আপডেট রবিবার, ৭ জুন, ২০২০

(সময়টা মধ্যরাত)
নদীর পাশে জেলেরা মাছ ধরার জন্য টং পেতে রেখেছে,সেখানেই মুখোমুখি বসে আছে দুই তরুণ তরুনি।
-ভাগ্য যে কখন কার সাথে কি খেলা খেলে তা বোঝা বড়ই মুসকিল। একটা পরিবারের জন্য বাবা যে কতোটা মুল্যবান তা আমার চেয়ে ভালো আর কেউ হয়তো জানেনা। বটগাছের মতোই ছায়া দিয়ে,বাতাস দিয়ে পরিবারকে আগলে রাখার অপরিসীম ধৈর্য্যও শক্তি তাদের থাকলেও নির্দিষ্ট একটা সময়ের পর প্রতিটি বাবার হার্ট খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। আর সন্তানদেরকে তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা সব ত্যাগ করে উনাদের ইচ্ছে মতো কর্তব্য পালন করে যাওয়াই হয় সেই হার্ট দুর্বলতার একমাত্র ঔষধ। এ সময়টাতে বাবারা বুকের বাম পাশে হাত চেপে রেখে অনায়াসেই সমস্ত জটিল পরিস্থিতিও খুব সহজেই বদলে ফেলতে পারেন।
কি?হাস্যকর লাগলো বুঝি? হয়তো হাস্যকর! তবুও এই দেখুন না,আমি এখন বিয়ে করতে চাইছিলাম না এর জন্য হঠাৎ আমার বাবার বুকের ব্যথা বেড়ে গেলো। হৃদরোগের কারণে ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলাম। এখন আমি তার নিজের মেয়ে হয়ে আমার বাবার অসুস্থতার জন্য দায়ী হতে পারি না। তাই আমার সমস্ত স্বপ্ন, ইচ্ছা,অনিচ্ছা গুলো এই চাঁদনী পসর রাতে এই নদীতেই বিসর্জন দিয়ে দিলাম। নিজের কথা শেষ করে মৃদু হেসে ধ্রুবর দিকে তাকালো নওসিন।
আজ মেয়েটার খুব মন খারাপ। সেই বিষন্নতা স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে মেয়েটার মুখে।
বিশ বছর এর তরুণীর ভীষণ মন খারাপের দেশে তেইশ বছরের ধ্রুবও হয়তো হারিয়ে যাচ্ছিলো। নিজেকে সামলে কান্না ধরা গলায় জিজ্ঞেস করলো,
-পালাবেন নওসিন?
ধ্রুবর এমন প্রশ্নে চমকে উঠলো নওসিন। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে সামলে নিতে চাইলেও অনুভূতিগুলোর চোখ এড়ায়না সামনে বসে থাকা মানুষটার। নওসিনের নিজের অনুভূতি লুকানোর বৃথা চেষ্টা দেখে ধ্রুবর চোখে মুখে ফুটে ওঠে মৃদু হাসির রেখা। সে হাসি থেকে চোখ এড়াতে পারেনা নওসিন। এ জন্যই সে অতি দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে পোশাকের ভাঁজ ঠিক করতে করতে বলল,
-আমাকে এখন ফিরতে হবে।
আর এক মূহুর্তও অপেক্ষা না করে দ্রুত পা ফেলে সামনে এগুতে থাকে নওসিন। একটি বারের জন্যও আর পিছন ফিরে দেখলো না। কি এক অদ্ভুত বন্ধনে এই ছেলেটা তাকে বেধে ফেলেছে। আর কিছুক্ষণ থাকলে হয়তো সত্যিই তার সাথে সে পালাতে সম্মতি জানিয়ে দিতো।
মানুষের মন খুব দুর্বল। একটু আবেগেই সবকিছু ওলটপালট করে দিতে পারে। সাত দিন আগেও নওসিন এর পরিস্থিতি এমন ছিলোনা। সাত দিন আগেও যদি বিয়ের সম্মন্ধ আসতো,নওসিন ছেলের সাথে কথা বলার প্রয়োজনবোধ করতো না। কারণ সে জানে বাবা যা ভালো বুঝে তাই করবে। কিন্তু আজ তার মনের বন্ধ ঘরের ওপাশে তীক্ষ্ণ আলো বাড়িয়ে নিয়ে বসে আছে ধ্রুব। এই তীক্ষ্ণ আলো উপেক্ষা করার মতো দুঃসাহস নওসিন এর নেই। কেনো সে ধ্রুবকে উপেক্ষা করতে পারছেনা তা সে নিজেও জানে না। আচ্ছা,মাত্র সাতটা রাতের পরিচয়ে কি কাউকে সত্যি সত্যিই ভালোবেসে ফেলা যায়?
সেই সাত দিন আগে-
পড়ন্ত বিকেলবেলায় ছাদের কোনে বসে কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনছিলো নওসিন। উপন্যাসেন নায়িকাদের মতো বই পড়ার খুব একটা নেশা নেই ওর। শুধু আছে একটু গান শোনার অভ্যেস। তাইতো “সোয়াচান পাখি আমার সোয়াচান পাখি,আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি…” গানটা বেশ আনন্দের সাথেই শুনছিলো। সেই মুহূর্তে ওর মায়ের বকাবকি শুরু হলো।
উনি মাসখানিক হলো বাবার বাড়ি যাবেন বলে মনস্থির করেছেন কিন্তু দুই সন্তানের জন্য আজ যাই,কাল যাই করেও যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে না।নওসিন,নিশাত দুজন সন্তান নিয়ে একটা সুখী পরিবার নোমান আর রাজিয়া বেগম এর। তাদের কাছে ছেলে মেয়েই সব। প্রথম সন্তান হিসেবেই হোক অথবা অন্য কোনো বিশেষ কারণ থাকার ফলে ভদ্রলোক মেয়েকে কোথাও একা ছাড়েনি কোনোদিন। তাই মেয়েও হয়েছে কিছুটা ঘরকুনো স্বভাবের। তাই বলে নিকট আত্নীয়ের বাড়িতে যাওয়া তো বাদ দেওয়া যায় না। কিন্তু মেয়ে নারাজ৷ সে যাবেই না। এই নিয়ে বাক-বিতন্ডা চলছিলো বেশ কিছুদিন। শেষমেষ রাগ করে ফোনটা মেয়ের হাতে ফেরত দিয়ে চলে গেলেন রাজিয়া বেগম।ফোন হাতে নিয়ে কান থেকে হেডফোন সরিয়ে নওসিন বাবার সাথে কথা বলার জন্য ফোনটা কানে ধরলো,
-বাবা বলো!
-আমার মায়ের কি আজ মন খারাপ?
-আসলে বাবা,আমি যেতে চাচ্ছি না। তুমি তো জানো নদী আমার কতোটা পছন্দের। অথচ নানুবাড়ি গেলে আমাকে তো নদীতে নামতেই দাও না। রাতে বাহিরে বসে চাঁদ দেখতে দাও না। আজ তো আবার “চাঁদনী পসর” রাত। আগামী এক সপ্তাহ ধরে চাঁদনী পসরের জোসনা উঠবে। মাত্র এক সপ্তাহ ই তো থাকবে “চাঁদনী পসর” এ সময় নানু বাড়ি আমি যাই কিভাবে? বলো…
-আচ্ছা সমস্যা নেই। তুমি যাও ভালো লাগবে। তোমার খালাত বোনেরাও আসবে সবাই।
দেখবে আড্ডায় আড্ডায় তোমার মনেই থাকবে না “চাঁদনী পসর” রাতের চাঁদ জোসনার কথা…
বাবার কথা ফেলে দেওয়ার মতো মেয়ে নওসিন নয়। তাই মুহুর্তেই রাজী হয়ে যায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেতে হচ্ছে।
শহর থেকে নানুবাড়ি যেতে সময় লাগে মাত্র ৪০ মিনিট। পরিবারের জন্য একদম রিজার্ভ সিএনজি পাঠিয়ে দিলেন নোমান সাহেব। স্ত্রী কে কল দিয়ে বার বার করে কিছু মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। তবুও যেনো শান্তি পাচ্ছিলেননা মনে। কেমন যেনো এক নাম না জানা ভয় ঘিরে আসছে চারপাশ।
নানুবাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে মাগরিবের আজান পড়েছে। তাই দ্রুত নামাজ পড়ে নিতে হলো সবাইকে। এই নিয়ম নওসিনকে মানতেই হয়। নামাজ এবং নিয়ম করে কোর-আন শরীফ পড়তেই হয়। যেদিন গুলো নিজে পড়তে পারে না সেদিনগুলোতে তার মা যখন পড়ে তখন তাকে মন দিয়ে শুনতে হয়৷ না হলে নওসিন অসুস্থ হয়ে পড়ে।মাঝেমধ্যে অনিয়ম হলে তো নাক-মুখ দিয়ে রক্ত অবধি চলে আসে।তাই হয়তো বাবার এত চিন্তা তাকে নিয়ে।
সবার সাথে আড্ডায় মেতে উঠেছে নওসিন। ৫ বোন ওরা। সবাই সমবয়সী না হলেও খুব একটা পার্থক্য নেই।
ঋতু আর নওসিন সমবয়সী। বাকী ৩ জন আবার ওদের থেকে ৩ বছর এর ছোট। স্মৃতি,সুমি,জান্নাতি ওরা তিনজন সমবয়সী। ঋতু আর স্মৃতি দুই বোন। নওসিন এর বড় খালার মেয়ে এবং সুমি আর জান্নাতি বড় মামার মেয়ে৷ ছোট মামা এখনো অবিবাহিত। আর নওসিনরা তো দুই ভাই বোন। নিশাত আর নওসিন।
সন্ধ্যেবেলা সবার আড্ডা জমে উঠেছিলো নানির ঘরের পাশের বারান্দায়। বনেদি পরিবারে বাড়ি যেমন হয় ঠিক তেমন। তবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বদলেছে বাড়ির খুঁটিনাটি কিছু দিক।
হঠাৎ আড্ডার ব্যাঘাত ঘটালো একজন লোক। বাহির মহলে এসে খুব চেঁচামেচি করছে। মাগরিবের নামাজ পড়ে নওসিনের নানা সবে মাত্র অন্দরমহলে প্রবেশ করেছেন। লোকটার চেঁচামেচি করার কারণ জিজ্ঞেস করলে লোকটা বলতে থাকে,
-আমি আপ্নার দোকানে যেয়ে কইছি আমারে এইডা দিতে। দিছেও,কিন্তু অন্য একদিন একজন একটা নিছিলো সেডা ভালো ছিলো না। তাই কইছি আপ্নার সাথে আমার কথা আছে। ক্যানো আপনি হাজী মানুষ হইয়া দোকানে মেয়াদউত্তির্ণ জিনিস রাখছেন। এই কথা আমি আপনেরে জিগাইতে চাইছি। আপনে ছিলেন না আপনার দোকানের কর্মচারী আমার লগে তর্ক কইরা কইলো পরে নাকি সে ফেরত দিয়া ভালোডা দিছে। খারাপ জিনিস আপনারা রাইখা দিছেন। আমিও জানি,কিন্তু আমার কথা হইলো আপনার কর্মচারী উত্তর দিবো ক্যান? জিগাইছি আপনারে। একেক টা ছোট লোক।এই কথা কওয়াতে টিটকারী মাইরা আপনার কর্মচারী আমারে কয়,”বড়লোক ভাই আমাদের ভুল হইলে মাফ করিয়েন কিন্তু এখন বেচাকেনার সময় ভেজাল করিয়েন না।”
ক্যানো আপনি খারাপ জিনিস রাখবেন আর আমরা কইলেই দোষ? তারপর তাদের চোটপাট কি,বাপরে বাপ! মনে হয় আমারে গিল্লা খাইবো। যত্ততসব ছোটলোকের ব্যাবহার।
ভদ্রলোকের কথাশুনে নওসিন এর নানা মৃদু হেসে মাথা দুলিয়ে বললেন,
-আচ্ছা ভাই বুঝলাম।আপনি বসেন।আপনি যখন দোকানে গিয়েছিলেন তখন আমি ছিলাম না তাই ওরা উত্তর দিয়েছে। এটা দেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আপনি এই যে জাত তুলে কথা বললেন সে কথাগুলো কিন্তু আমি চাইলেই ফেরত দিতে পারি তাই না! কিন্তু দিবো না,কারণটা জানেন?
লোকটা বলল,
-এটা আপনার শিক্ষা। তাই আপনি দেন নাই। বা জাত তুলেন নাই।
-ওরা শুধু উত্তর দিয়েছে। এটা ওদের দায়িত্ব। তা হলে ভাই ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়? জাত তো আপনি তুলেছেন আগে। ওরা তো তোলেনি।
-ও বুচ্চি। আপনিও একই রকম। আসলেই আপনি এমন হইলে কি আর করার! আইছিলাম একটা বিহিত এর আশায়…
কথা বলে অপেক্ষা না করে লোকটা পা বাড়ায় বাড়ির বাহিরের দিকে। স্পষ্ট ভাবেই
লোকটা যুক্তিতর্কে না পেরে চলে যাচ্ছিলো এবং নওসিনের নানা কে যা ইচ্ছে বলেই চলেছে।
নওসিন বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-মনে হচ্ছে এই ব্যাটার লুঙ্গির নেংটি বাইন্ধ্যা উল্টো করে নদীর পাশের বালুর চর এ গলা পর্যন্ত পুতে রাখি…
ওর কথা শুনে বাকী সবাই হাসলেও ঋতু ততক্ষনে জিভ এ কামড় দিয়ে থম মেরে বসে পড়েছে।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে তার। হঠাৎ গলাটা অজানা তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে। ঋতু ভীত চোখে নওসিনের দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বললো,
-আহ্!নওসিন, হচ্ছেটা কি? এভাবে কি কেউ বলে?
রাতে নওসিন মা এবং নানির মধ্যখানে শুয়ে আছে। ঘুম আসছে না। কেনো জানি না নানি তার আঁচলের সাথে নওসিনের হাতটা বেধে রেখেছে। আস্তেধীরে শরীরের উপর থেকে মায়ের হাত সরিয়ে দিয়ে নওসিন হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। গ্রিল এ তালা লাগানো দেখে এক দফা হতাশ হলেও পুনরায় পুরো দমে চাবি খুঁজতে শুরু করে। একসময় চাবি পেয়ে খুব সতর্কতার সাথে বেরিয়ে আসে বাড়ি থেকে।
ঘড়ি জানান দিচ্ছে রাত তখন দেঢ়টা বাজে। মাথার উপর এক ফালি চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। মাথায় ওরনা পেচিয়ে নওসিন পা বাড়ায় নদীর দিকে।চারপাশে নীরবতা।কোথাও একটা পাখিও শব্দ করছে না। শুধু হালকা বাতাস বইছে। নদীর পাড়ের খানিকটা দূরেই পাকা সড়ক।সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লো নওসিন। চাঁদনী পসরের জোসনার আলোয় নওসিন একটা অবয়ব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো। টকটকে লাল পাঞ্জাবী পড়ে কেউ একজন নদীর পাড় থেকে পানির দিকে ধিরে ধিরে এগিয়ে যাচ্ছে।
নওসিনের মস্তিষ্কে প্রথম যে কথা এলো তা হলো “ছেলেটা আত্নহত্যা করতে যাচ্ছে”
হ্যাঁ! আত্নহত্যা করতে যাচ্ছে। তা না হলে এতো রাতে নদীর পাড়ের পানিতে কেনো নামবে?
নওসিন দ্রুত দৌড়ে গিয়ে ছেলেটার হাত ধরে ফেললো।
আহ্!কি উষ্ণ স্পর্শ !
হাত ধরে টেনে পাকা রাস্তায় নিয়ে আসতে আসতেই নওসিন এর মনে হচ্ছিলো কোনো এক অজানা অনুভূতি যেনো তার শরীর দিয়ে বিদ্যুৎ চমকের মতো প্রবাহ তৈরি করেছে। তার হার্টবিটটাও দ্রুত ওঠানামা করে জানান দিচ্ছে সে কথা। লজ্জায় বেশ খানিকটা লাল হয়ে ছেড়ে দেয় ছেলেটার হাত…
(চলবে….)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ