• বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ০১:২৪ পূর্বাহ্ন
  • English Version
Notice :
***শর্ত সাপেক্ষে সাংবাদিক নিয়োগ দিচ্ছে সংবাদ২৪**আগ্রহীরা সিভি পাঠান এই ইমেইলেঃinfo@shangbad24.com

চাঁদনী পসর (পর্বঃ০২)

মোঃসারোয়ার হোসেন(হাবীব)
আপডেট শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২০

পর্বঃ০২
———————————–
নওসিনের ছোটবেলার সমস্যাটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়েছে। তার মা বুঝতে পেরেছেন মেয়ে তার চাঁদনী পসরের চাঁদ দেখেছে। সমস্যাটা শুরু হয়েছিলো তার জন্মের ঠিক পড়েই,রোজ সন্ধ্যার পর যখন আকাশে চাঁদ উঠতো তখন নওসিন কান্না শুরু করতো,দাদী,নানী,এমনকি মা পর্যন্ত ও সে কান্না থামাতে পারতোনা। পরে তার মা তাদের গ্রামের বাড়িতে ফোন করেন। তার দাদা ছিলেন আলেম মানুষ,উনি কিছুটা আঁচ করেই নওসিনদেরকে গ্রামের বাড়ি আসার জন্য বলেন। নওসিনের বাবা কিছুদিনের ছুটি নিয়ে বগুড়ায় ফিরে আসেন। তার দাদা নওসিনকে দোয়া,দরুদ ও চার কুল (কুল দিয়ে শুরু হওয়া সুরা) সমেত একটা সুতাতে সাতটা গিট দিয়ে নওসিনের গলায় পড়িয়ে দেন। বলা হয়ে থাকে নবজাতকদের আত্মা খুব দূর্বল হয়ে থাকে এজন্য তাদের প্রতি কু নজর থাকে সবচেয়ে বেশি কেননা খুব সহজেই তাদেরকে বশ করা যায়। অনেক মায়েরা এখনো সন্তানদেরকে এ সব কুনজর থেকে বাঁচাতে ছোট বাচ্চাদের কপালের বামপাশে বিরাট আকৃতির টিপ একে থাকেন। কিন্তু এ সব কুসংস্কার ছাড়া আর কিছু না। ইসলামে এই টিপের ব্যাপারে কোনো সমর্থন নেই। যাইহোক সুতার মালা পড়ানোর পর থেকে নওসিনের আর কোনো সমস্যা হয়নি। তারপর স্বাভাবিক ভাবেই সে বড় হতে থাকে কিন্তু ঘটনাটার পুনরাবৃত্তি ঘটে সে যখন সাত বছরে পা রাখে তখন। এ পর্যন্ত ঐ সুতা তার গলা থেকে খোলায় হয়নি। নানী বাড়ি এসে নওসিন তার ছোটমামার সাথে নদীতে গোসল করতে গিয়েছিলো। তখনি হয়তো কোনোক্রমে সুতাটা খুলে নদীর স্রোতে ভেসে যায়। তার গলায় যে সুতাটা নেই তা কেউ ই তখন খেয়াল করেন নি। কিন্তু আসল বিপত্তিটা বাঁধে রাতের বেলায়। সেদিনও ছিলো চাঁদনী পসর রাত,আকাশে বিরাট আকারের রুপালি চাঁদ আস্তে আস্তে দুধের মতো ধবধবে সাদা হয়ে ওঠে মধ্যরাতের পর চাঁদটা আবারো হালকা আগুনের বর্ণ ধারণ করতে থাকে। সেই চাঁদনী পসর রাতে সাত বছরের নওসিন কি এক অমঘ টানে ছুটে যায় নদীর দিকে,চাঁদ তখন দুধের মতো ধবধবে সাদা বর্ণ ধারণ করেছে। সে একা সম্মোহনের মতো ঠায় দাড়িয়ে নিষ্পলকভাবে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে। এদিকে বেশ খানিকটা সময় পর তার মায়ের হঠাৎই ঘুম ভেঙ্গে যায়,পাশে নওসিনকে না দেখে চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘর এক করে তোলেন,শুরু হয় খোঁজাখুজি। তাকে জেলেদের বানানো টং এ পাওয়া যায় অজ্ঞান অবস্থায়। এতো ছোট মেয়ের এতোরাতে একা একা এতোদুরে আসার সাহস জোগালো কে এটা তাদের মাথায় না ঢুকলেও তার মা হঠাৎ লক্ষ্য করেন নওসিনের গলায় সুঁতাটা নেই। তখনিই নওসিনকে নিয়ে যাওয়া হয় মসজিদের ইমামের কাছে। ইমাম অতিশয় মিষ্ট স্বভাবের,এতো রাতেও উনি নিজে আগ্রহ করে দায়িত্ব নিলেন,নওসিনের মাথায় পানি দেওয়া হলো,ততক্ষনে উনি নওসিনের পাশে বসে মৃদু স্বরে সূরা রহমান পাঠ করলেন। অবশেষে নওসিনের জ্ঞান ফিরলো,ইমাম সাহেব বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শুধু বলেছিলেন,
-“কোনো জোসনার রাতে মেয়েকে কখনো একা ছাড়বেন না।যে পর্যন্ত এই মেয়ে নিজের ভালো নিজে না বুঝবে।নামাজ,কোর-আন পড়ায় যেনো কোন ভাবেই অনিয়ম না করে এ দিকে লক্ষ্য রাখবেন। যেহেতু মেয়ে মানুষ তাই ঋতুবর্তী হবেই।সে দিন গুলোতে তাকে নিয়ম করে কোর-আন তেলাওয়াত শোনাবেন। কোরআনের আয়াত হলো সর্বরোগের মহাঔষধ।”
এ জন্যই নওসিনকে নিয়মকরে নামাজ এবং কোরআন পড়তেই হয়। আর এ সব কারণেই হয়তো নানুবাড়ি আসার সময় তার বাবা তার মাকে বার বার ফোন করেও হয়তো স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। সেদিনের পর থেকে এ পর্যন্ত তো আর কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু আজ হঠাৎ এতোবছর পর কেনো এমন হলো এটা ভেবেই রাজিয়া বেগম অস্থির হয়ে পড়লেন। নওসিনের নানী হয়তো আগেই জানতে পেরেছিলেন যে এমন কিছু একটা হতে পারে এ জন্যই তো তার শাড়ির আচল দিয়ে নওসিনের হাত বেঁধে রেখেছিলেন,কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো কই?
সকালবেলা ডাক্তার এসেছিলো,উনি সমস্ত পরিক্ষা করে জানালেন,শরীরের তো কোনো সমস্যাই নাই সবকিছুই স্বাভাবিক আছে। হার্টবিট নরমাল,প্রেশার নরমাল,নাড়ির গতিও ঠিক আছে,একজন সুস্থ্য মানুষের যে সকল সিমটম থাকে নওসিনের তা সবকিছুই আছে। এ বলে উনি চলে গেলেন,ঋতু এসে নওসিনের পাশে বসতেই নওসিন হুড়মুড়িয়ে উঠে বসেই জিজ্ঞেস করলো,
-কি রে ঋতু,আমার ঘরে এতো মানুষজন কেনো? আমার কি হয়েছে?
ঋতু বেশখানিকটা অবাক হয়ে গেলো,এতোক্ষণ তারা যে মেয়েকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করছিলো সে হঠাৎ করেই এমন সুস্থ্য স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে এটা যেনো সে বিশ্বাস ই করতে পারছেনা। নওসিন আবারো ঋতুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো,
-কি রে,থম মেরে বসে আছিস যে! শোন না আমার বড্ড খিদে পেয়েছে আর খুব করে সেদ্ধ ডিম খেতে ইচ্ছে করতেছে।
নওসিনের কথা শুনে রাজিয়া বেগম উঠে গেলেন ডিমসেদ্ধ করার জন্য,ঋতু মৃদু হেসে বললো,
-তুমি এখন কেমন আছো নওসিন আপু?
-আমার আবার কি হবে? ওদেরকে বল তো আমার রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে,আমার মাথায় কি দুইটা সিং গজিয়েছে যে আমাকে এভাবে এসে দেখেতে হবে।
-আসলে আপু,এটা তো গ্রাম। একজনের সমস্যা দেখার জন্য এরা ছুটে আসে। কারোর কিছু হলেই এরা খুব উৎসাহ নিয়ে ব্যাপারটা দেখতে আসে। তুমি বরং চুপচাপ সুয়ে থাকো,আমি কুরআন তিলাওয়াত করি…
-শুয়ে থাকবো কেনো? তার চেয়ে বরং চল মামির বানানো আচারগুলো শেষ করি,কাল দেখেছি মামি দুই বয়েম আচার আমার আড়ালে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। ওগুলো না শেষ করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই।
দুজনে টুপ করে বিছানা থেকে নেমে পড়লো,আচারের বয়েমদুটো দু বগলে ধরে খুব সাবধানে নানার ঘরে চলে এলো। এ ঘরে খুব একটা কেউ আসেনা,নানার প্রতি সম্মান রেখেই হোক আর নানার প্রতি ভয়েই হোক। আচার খেতে খেতে নওসিনের মনে পড়ে গেলো গতকাল রাতের কথা।
ছেলেটা সত্যিই সুইসাইড করতে যায়নি।
নওসিন যখন জিজ্ঞেস করলো তাহলে এতো রাতে নদীর পাড়ে কেনো এসেছেন?
সে বলেছিলো,
-আপনি মেয়ে হয়েও তো এতো রাতে এখানে এসেছেন,তো আপনি কি কারণে এসেছেন জানতে পারি?
-ওসব বাদ দিন। মনে রাখবেন আত্মহত্যা মহাপাপ! কেনো নিজের জীবন এভাবে…
-একটু থামুন মিস নওসিন। আপনাকে কে বলেছে আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলাম?
-তাহলে কি এতো রাতে নদীর পানিতে গোসল করতে এসেছেন?
-আমি কি কারণে এসেছি সেটা নাহয় পরে জানবেন আগে আপনি বলেন তো,এতো রাতে এখানে কেনো?
-এইতো একটু ঘুরতে এলাম আরকি!

-রাত দু টার সময় একটা মেয়ে একা ঘুরতে বের হয়, আজকে প্রথম দেখলাম।
-হয়তো দেখেন নি। কিন্তু আমি এমনই, কেনো এসেছি জানেন? ওই যে মাথার উপর এক বাটি দুধ উপুড় হয়ে আছে সে দুধের আলোয় দেখুন নদীর পানি ঝলমল করছে। এমন জোসনা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে দুরে ঠেলে কি করেই বা ঘরে বসে থাকি বলেন। জীবন তো একটায়,আমি চাই এ জীবনে সমস্ত সৌন্দর্য্য অবলোকন করতে,ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সময় পার করলে সুন্দর্য্যটা মিস হয়ে যেতো। তাছাড়া আমি অন্তত এই চাঁদনী পসর রাত কখনোই মিস করতে পারবো না।
-চাঁদনী পসর! হুম তাই তো,আজ তো আমার সামনে আস্ত একটা চাঁদই এসে দাঁড়িয়েছে।
-ঠাট্টা করছেন? আমি কিন্তু ততটাও সুন্দর নই,আচ্ছা আপনি আমার নাম জানেন কিভাবে? আমি তো চিনি আপনাকে চিনি না।
-আপনি রেনু ফুপুর ছোট বোন রাজিয়া ফুপুর বড় মেয়ে নওসিন। আপনাদেরকে এই গ্রামে কে না চিনে? বড় বাড়ির সম্পর্কে খুটিনাটি খবর আমাদের মতো গ্রামবাসিদের সবার কাছেই থাকে।
বুঝতে পেরেছে এমন ভাবে মাথা দুলিয়ে নওসিন বললো,
-ও আচ্ছা! যাইহোক আপনি এখানে কি করছেন?
-আপনি চাঁদনী পসরের চাঁদ দেখতে এসেছিলেন আর আমি হয়তো এসেছি আপনার টানে…
-ঠিক বুঝলাম না।
-ততটাও বুঝতে হবে না,আপনি বরং চাঁদ দেখুন ভয় নেই আমি পাশে দারিয়ে আছি।
-আচ্ছা আপনার নাম ই তো জানা হলো না…
-আমি ধ্রুব
-চাঁদনী পসরের এই চাঁদটা ওঠার আগে সর্বপ্রথম যেই তারাটা সবচেয়ে উজ্জল আর বড় দেখায় সেই তারাটার নামও কিন্তু ধ্রুব তারা।
-বাহ্! মহাকাশ সম্পর্কে তো আপনার দারুন জ্ঞান দেখছি…
-জানিনা,তবে কেনো যেনো মনে হয় এই চাঁদ,তারা,গ্রহ,মহাকাশ,নদী,গাছ,পাখি,ফুল সকলেই আমার খুব খুব আপন। আচ্ছা নওসিন নামের একটা মেয়ে যে একসময় পৃথিবীতে এসেছিলো আমি মরার পরে কি এরা এটা মনে রাখবে?
-প্রকৃতি কোনো প্রতিদান ঋণ করে রাখে না,প্রকৃতির ধর্মই হলো দান করা। অবশ্যই তারা আপনার প্রতিদান ফেরত দেবে,মায়ার বদলে মায়া,হিংস্রতার বদলে দুর্যোগ…
নওসিন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ছেলেটার কথা শুনছিলো,মানুষ এতোটা সুন্দরভাবে গুছিয়ে গুছিয়ে যুক্তি সহকারে কথা বলতে পারে তা এই ছেলেকে ছাড়া জানতেই পারতোনা। নওসিন আর কথা বাড়ালো না,কতোক্ষণ যে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিলো তার মনে নেই,তাকে বাস্তবে ফিরতে হলো ধ্রব এর ডাকে,
-এই যে চাঁদের বুড়ি,রাত তিনটা ১৫ বাজে,আর কতোক্ষণ দেখবেন এই একটা চাঁদ? পাশে যে আমি দারিয়ে আছি কই সে খেয়াল তো রাখেন নি? ইশ্! খুব আফসোস হচ্ছে,মানুষ না হয়ে চাঁদ হতে পারলে জীবন সার্থক হতো।
নওসিন লজ্জা পেয়ে গেলো,আমতা আমতা করে বললো,
-আ…আপনি এখনো এখানে আছেন ই,আমি আসলে খেয়াল করিনি,ভেবেছিলাম চলে গেছেন।
-একটা সুন্দরী মেয়েকে চাঁদের হাতে একা ছেড়ে কেমন করে যাই বলুন। হিংসে হয়…
নওসিন মাতালদের মতো হালকা চোখ উল্টে দুলে ওঠে তাই দেখে ধ্রুব তার মাথায় হাত দিয়ে দেখে নওসিনের প্রচন্ড জ্বর। নওসিনের হাত ধরে ধ্রব তাকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যায়।
-কি রে নওসিন এত্তো আচার সত্যি সত্যিই সব খেয়ে ফেলবি নাকি! সুমি জান্নাতিকেও ডাকি একটু…
ঋতুর কথা শুনে নওসিনের ভাবনার ঘোর কাটলো,
-জানিস ঋতু,আমার কেমন যেনো এখনিই খুব দই খেতে ইচ্ছা করছে…
-এতো সকালে দই পাবে কই? বিকেলে নানা বাজারে যাবার সময় মনে করে দিয়ো,আনতে বলবোনি…তুমি থাকো আমি জান্নাতি আর সুমিকে ডেকে আনি…
নওসিন আপন মনে আচার খেতে লাগলো,একটু পর ঋতু এক সরা দই নিয়ে ঢুকলো নানার ঘরে নওসিনের সামনে সরাটা রাখতে রাখতে বললো,
-এটা তো বড়ই আশ্চার্য গো নওসিন আপু,দেখো তুমি দই খেতে চাইলে অথচ আজ সকাল সকালই এক দইওয়ালা অন্দরে এসে হাজির! সুমিকে খুঁজে না পেয়ে বাহিরে উঁকি দিতেই দেখি এক দইওয়ালা এসেছে,সবাই জটলা করে দই কিনছে,তখনিই আমার তোমার কথা মনে হলো,মায়ের ব্যাগ থেকে টাকা বের করে অমনিই কিনে ফেললাম। বগুড়ার বিখ্যাত দই,খেয়ে দেখোতো খাঁটি দই নাকি বগুড়ার দই নাম ভাঙ্গিয়ে ব্যাবসা করার ধান্দা করেছে।
-দই কি দিয়ে খাবো,চামচ কই?
ঋতু আবারো দাঁতে জীভ কেটে বেরিয়ে গেলো চামচ আনতে,নওসিন মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে হাত ডুবিয়েই দই খেতে লাগলো। বেচারি ঋতু এসে দেখবে আমার দই খাওয়া শেষ!

এদিকে অন্দরে নওসিনের খোঁজ চলতেছে,অসুস্থ মেয়েটা ডিম খেতে চেয়ে কোথায় গেলো এই সামান্য চোখের আড়ালটাও যেনো রাজিয়া বেগম সহ্য করতে পারছেন না।
নওসিনের নানি রান্না ঘরে পায়েস রান্নায় ব্যাস্ত,কোনো সমস্যায় পড়লেই উনি হয় খিচুড়ি নয়তো পায়েস রেধে মসজিদে সিরনি করেন। আজকেও এর ব্যাতিক্রম হচ্ছে না। তিনি এক হাফেজকে খবর দিয়েছেন,বিকেল বেলা সে এসে কুরআনের কয়েকটা বিশেষ সুরা পাঠ করে যাবেন। সুমি আর জান্নাতি বারান্দার এক কোনায় বসে মোবাইল টিপছে আর একটু পর পর হি হি করে হাসাহাসি করতেছে।
নওসিনকে পাওয়া যাচ্ছেনা শুনেই মামি দুই এ দুই এ চার মিলিয়ে ফেললেন,রাজিয়া বেগমকে বললেন,
-শোনেন বুবু আপনার মেয়ে যে আচার খাদক তা তো আমরা সকলেই জানি,আমাকে বললে কি আমি ওকে আচার দিতাম না? হাজারো হোক অসুস্থ একটা মেয়ে আচার খেতে চাইছে আমি তো আর না করতে পারতাম না। যাই হোক,আমার করে রাখা দু বয়েম আচারও খুঁজে পাচ্ছিনা,নিশ্চয় দুটিতে মিলে আমার আচারের পেছনে লেগেছে।
ঋতুকে দেখেই মামি ছুটে গেলেন ঋতুর কাছে,
-কি রে নওসিন কই? আমার আচারের বয়েম কি নওসিনের কাছেই আছে? দেখেন বুবু ঠিক ধরেছি এই যে ওর হাতে একটা চা চামচ,নিশ্চয় কোথাও ঘাপটি মেরে আচার খাবার সর করছে।
ঋতু কিছু না বলে চুপচাপ দারিয়ে থাকলো,রাজিয়া বেগম এসে ওর হাতে দুটো সেদ্ধ ডিম দিয়ে নওসিনকে দিতে পাঠালেন। রাজিয়া বেগম জানেন তার ভাবীর স্বভাব,ভাবী কিপটা স্বভাবের হলেও তার মনটা বড্ড সরল। কাউকে কিছুই দিতে চাইবেনা কিন্তু যে চাইছিলো সে ভুলে গেলেও ভাবী সে কথা মনে রাখে,হঠাৎ সামনে এনে সেই কাঙ্খিত জিনিস হাজির করেন। একসময় যে সেটা চাইছিলো সে সারপ্রাইজ হয়ে যায়। এমন আনন্দিত মুখ দেখার জন্যই রাজিয়ার ভাবী এমন কিপটেমি ভাব দেখায়।
ঋতু নানার ঘরে ঢুকেই আরেক দফা হতভম্ব হয়ে গেলো,এতোটুকু সময়ের মধ্যেই দুই বয়েম আচার খালি হয়েছে সাথে দইয়ের সরাটাও পরিষ্কার,আর নানার বিছানায় খুব আরামে ঘুমাচ্ছে নওসিন। ঋতু আর তাকে ডাকলো না সেদ্ধ ডিমের বাটি ড্রেসিং টেবিলে রেখে খালি বয়েম আর সরাটা নিয়ে বেড়িয়ে এলো।
বেলা ১২টার সময় নওসিনের ঘুম ভাংলো,মাথাটা এখনো বেশ ভারি হয়ে আছে,কিছু বোঝার আগেই নানার বিছানাতেই হরবর করে বমি করে দিলো। ঋতু ছুটে গিয়ে সবাইকে খবর দিলো,রাজিয়া বেগম বিছানার চাদর তুলো গুটিয়ে রেখে মেয়ের পাশে বসলেন। তিনি মনস্থির করলেন তিনি আর এখানে থাকবেন না,শহরে ফিরে যাবেন। নওসিন সবার দিকে এক সেকেন্ড করে তাকিয়ে থেকে বললো,আমি গোসল দিবো,গা গোলাচ্ছে আমার শরীরে কেমন যেনো আঁসটে গন্ধ পাচ্ছি,আমি গোসল দিবো…
রাজিয়া বেগম মেয়ের হাত ধরে টিউবয়েল পাড়ে বসালেন। নওসিন টিউবয়েল পাড়ের মেঝেতে লেপ্টে বসে আছে রাজিয়া বেগম মেয়ের মাথায় পানি ঢেলেই চিৎকার করে উঠলেন। সচ্ছ পানি নওসিনের মাথায় পড়ে রক্তের মতো টকটকে লাল হয়ে চুয়ে পড়তে লাগলো। আবারো একদফা সবাই নওসিনকে নিয়ে চিন্তায় পড়লো।
মেয়েটার আসল সমস্যাটা যে কি তা তারা কেউ ই ধরতে পারতেছেনা। ডাক্তার রা সব চেক করে বলে সে সুস্থ আবার কবিরাজ ও বলে তেমন তো কোনো সমস্যা নেই,তাহলে হয়েছেটা কি? কোনো মা কি নিজের মেয়েকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখতে পারে,অবশেষে রাজিয়া বেগম নওসিনের নানি কে বললেন তারা কালকেই শহরে ফিরে যাবেন। শহরে বড় বড় ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন। নওসিনের নানি রেনুকা বানু বললেন,
-ক টা দিন দেরি করে যা,এক ফকির কে খবর পাঠাইছি দু এক দিনের মাঝেই চলে আসবে,আমার মনে হচ্ছে তোর মেয়েকে কেউ তুক করেছে। বান কাটানো দরকার,ডাক্তার তো শরীরের রোগ সারায়,শরীর ছাড়াও যে মন এবং রুহে জানা অজানা রোগ বাসা বাঁধে তা তারা জানেনা। তুই বরং মেয়ের পাশে বসে বেশি বেশি আ’হাদ নামা পাঠ কর। কিতাবে আছে হযরত জাবের (রাঃ) বলেছেন যে,আমি মহানবী (সাঃ)-এর কাছ থেকে শুনেছি যে মানুষের শরীরে তিন হাজার রোগ আছে। এর মধ্যে এক হাজারের ঔষধ চিকিৎসকগণ জানেন এবং তারা ঐসব রোগেরই চিকিৎসা করে থাকেন,আর বাকি দুই হাজার এর ঔষধ কেউ ই জানেনা। যে ব্যাক্তি আ’হাদ নামা পড়বে ও নিজের সাথে রাখবে আল্লাহ তা’আলা তাকে ঐ তিন হাজার রোগ থেকে মুক্ত রাখবেন ইনশাল্লাহ। কাজেই এখন দুঃশ্চিন্তা করিস না,ধৈর্য্য রাখ। আর তোদেরকে এখানে আনার একমাত্র কারণ হচ্ছে ঋতুর বিয়ে দেওয়া। আগামিকাল পাত্রপক্ষরা ওকে দেখতে আসবে। ভালোই ভালোই সব মিটে গেলেই ভালো তাছাড়া শহরে তোরা একা হয়ে পড়বি,এখানে আমরা সবাই আছি,ভালোমন্দ দেখারও একটা ব্যাপার আছে। এই যে মাঝে মাঝে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যাস এই সান্তনাগুলো অন্তত এখানে থাকলে তোকে দিতে পারবো…যা ঘরে যা,তাকের ওপর পাঞ্জেগানা কেতাব আছে,ওখানেই আ’হাদ নামা পাবি। যোহরের সময় হলো,মেয়েকে পাক সাফ করে রেডি কর যোহরের নামাজ পড়ে কিছু খেয়ে নিয়ে বসে পড় আ’হাদ নামা তারমধ্যেই হাফেজ আব্দুল্লাহ এসে যাবে। তারপর দেখি কি করা যায়। আল্লাহ চাহেন তো নিশ্চয় ভালো হবে তোর মেয়ে…
রাজিয়া বেগম চোখের পানি মুছতে মুছতে মেয়ের ঘরের দিকে গেলেন।
(চলবে…)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ