• বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:০৪ অপরাহ্ন
  • English Version
Notice :
***শর্ত সাপেক্ষে সাংবাদিক নিয়োগ দিচ্ছে সংবাদ২৪**আগ্রহীরা সিভি পাঠান এই ইমেইলেঃinfo@shangbad24.com

চাঁদনী_পসর পর্বঃ০৩

লেখক-মোঃসারোয়ার হোসেন(হাবীব)
আপডেট রবিবার, ৭ জুন, ২০২০

আজকে রাতে খুব কড়াভাবে নওসিন কে পাহারা দেওয়া হবে। নওসিনের নানি জাগবেন প্রথম একটা পর্যন্ত। তারপর উনি ঘুমোনোর আগে রাজিয়া বেগমকে জাগিয়ে দিবেন। উনি ফজর পর্যন্ত জাগবেন। কোনো সমস্যা হলেই যেনো টের পাওয়া যায়। বিকেল বেলায় হাফেজ আবদুল্লাহ এসে সুরা রহমান আর মুলক পাঠ করে গেছেন দুটা সুরায় মাহাত্বের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ।

সুরা আর-রহমান এ স্পষ্ট বলা হয়েছে “ফাবি আইয়্যি আলায়ি রাব্বিকুমা তুকাযজিবান্…” অর্থাৎ,তোমরা তোমার সৃষ্টিকর্তার কোন নিয়ামাতকে অশ্বীকার করবে?….আর সুরা মুলক হলো এমন একটি সুরা যেটা পাঠ করলে মৃত্যুর যন্ত্রনা পর্যন্তও থাকবেনা এমনকি কঠিন বিপদে পড়লে এই সুরা পাঠের মাধ্যমে সেই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। নওসিনের নানী একপাশে বসে তসবি গুনছিলেন। সবাই খেয়েনিয়ে সবেমাত্র শুয়ে পড়েছে। রাজিয়া বেগম ঘুমোতে চাচ্ছিলেন না হাজারো হোক মায়ের মন বলে কথা। কিন্তু এভাবে মেয়েটাকে কতোদিন বাঁচানো যাবে। মেয়ে হয়ে জন্মেছে যখন,বিয়ে তো তাকে দিতেই হবে।

এখন নিজের আপনজনদের কাছে আছে বিধায় এতোটা যত্ন পাচ্ছে,শশুড় বাড়ির লোকেরা আর কতোই বা করবে তার জন্য। একটা বৌমা হারালে তারা আরেকটা বৌমা পাবে,কিন্তু আমাদের একটা কলিজার টুকরা হারালে আমরা তাকে পাবো কেমন করে? দেখতে দেখতে দেঢ়টা বাজলো। নওসিনের নানী তার মেয়ে রাজিয়া বেগম কে জাগিয়ে তুলে শুয়ে পড়লেন,এ মুহুর্তে নওসিন একটু নড়ে উঠলো।

(রাত প্রায় ২টা পাঁচ মিনিট)
নওসিন এখন জেলেদের পাতানো সেই টং এ বসে আছে। বাহিরে চাঁদনী পসরের পূর্ণ চন্দ্র রেখে কি করে সে ঘুমিয়ে থাকবে,হঠাৎ করেই পেছনে কার যেনো উপস্থিতি টের পেলো নওসিন। নওসিন চোখ ফেরালো না,চাঁদের দিকে তাকিয়েই বললো,
-আজকে কেনো এসেছেন ধ্রব?
-চাঁদনী পসর দেখতে…

এ মুহুর্তেই নওসিন পেছনে ফিরে অবাক দৃষ্টিতে তাকালো ছেলেটার দিকে। আশ্চর্য তো! ছেলেটা কাপড় ছাড়েনা নাকি! সেই টকটকে লাল রংয়ের পাঞ্জাবি,উসকো চুল আর ঠোটের কোনে হাসি। কি এক অজানা আকর্ষণ জরিয়ে আছে তার সেই হাসিতে।
-আজ কি করে এলেন মিস নওসিন? আজ তো আপনাকে পাহারা দেবার কথা ছিলো…
-আপনি কি করে জানলেন? আপনার চরিত্রটা বেশ রহস্যজনক।

-তুমিও কি কম রহস্যময় মিস নওসিন…
-কি বলতে চাইছেন?
-বলোতো পৃথিবীতে এত্তো মেয়ে থাকতে একমাত্র তুমিই কেনো চাঁদনী পসর দেখার জন্য ঘরে থাকতে পারোনা?
তুমি কি এই চাঁদের আলোতে কারোর ফিরে আসার কিংবা নিজে কোথাও চলে যাবার অপেক্ষা করোনা?
নওসিন চুপ করে গেলো। তার মাথা কাজ করছেনা। সত্যিই তো! কি এমন যোগসংযোগ যে চাঁদনী পসর তাকে এতো আপন করে টানে। মুহুর্তেই নওসিন সম্মোহনের মতো হয়ে নদীর পাড় ধরে হাটতে থাকে অজানা গন্তব্যে…
ধ্রুব তার হাত ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলে,
-নিজেকে নিয়ে এতোটাও দুশ্চিন্তা করোনা,সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে,তুমি নিজে চাইলেই সব কিছু ঠিক করতে পারো। ঘরে ফিরে যাও আর কোরআন তিলাওয়াত শোনো। কোরআন যদি হাসরের কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষকে সাহায্য করতে পারে তাহলে দুনিয়ার সামান্য বিপদ থেকে উদ্ধারেও সাহায্য করতে পারবে।
আগের দিনের মতোই ধ্রুব নওসিনকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। সে নিজেও বুঝতে পারছে সকালে সে আবারো অসুস্থ হয়ে পড়বে। নিয়তি তার সাথে কি যে লুকোচুরি খেলছে তা সে নিজেও জানেনা।
পরের দিন সকালবেলা নওসিনের আবার জ্বর হলো। বারান্দায় মোড়া পেতে বসে আছে নওসিন। জান্নাতি আর সুমি নওশিনের মাথায় তেল মালিশ করতে ব্যাস্ত, যদিও বা এতে নওসিনের একটু আরাম বোধ হয় এজন্য। বাড়িতে আজ অন্যরকম আয়োজন চলছে,সবাই টুকটাক কাজে ব্যাস্ত। ঋতুকে আজ পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। বড় মামা সকাল সকাল বাজার করে এনেছেন সঙ্গে কয়েক প্রকারের ফল লিচু,আংঙ্গুর,মালটা,আপেল। স্মৃতি বসেছে সুমির ডানপাশে। নওসিনকে বললো,
-আচ্ছা আপু ওরা কখন আসবে?
সুমি নওসিনের মাথায় বিলি কাটতে কাটতেই বললো,সকালে যখন আসেনি তাহলে সম্ভবত দুপুরের পর আসবে। না হলে তাদের আবার ফিরে যেতে দেরি হয়ে যাবে।
নওসিন মাথা দুলিয়ে বললো,
-ওরা আসবে ঠিক মাগরিবের নামাজের ১০/১৫ মিনিট পর।
জান্নাতি হাতে থাকা তেলের বাটি নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-তুমি কি করে জানলে আপু?
-মনে হলো…
সবাই মনে দ্বিধা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো তার কথা সত্যিই কি মিলবে নাকি মিলবেনা। এ জন্য তাদেরকে পাত্রপক্ষ না আসা অব্দি অপেক্ষা করতে হবে। নওসিন জান্নাতিকে বললো একটা আপেল এনে দিতে। কেনো যেনো হঠাৎই নওসিন আবারো সুস্থ হয়ে উঠেছে। তার মুখে কোনো বেদনার ছাপ নেই। নওসিনের নানি এর মধ্যেই দুবার এসে দেখে গেছেন নওসিনের অবস্থা। তাদের পারিবারিক ডাক্তার মোহন্তকে খবর দেওয়া হয়েছিলো। তিনি এসে বসার ঘরের জলচৌকিতে বসেছেন। তাকে আপেল আর মাল্টা কেটে দেওয়া হয়েছে। উনি কয়েক পিচ আপেলের চক খেয়েই চলে এলেন নওসিনের ঘরে। নওসিন তখন বিছানায় শুয়ে ছিলো। ডাক্তার প্রথমে প্রেসার পরিক্ষা করলেন। তারপর হৃদস্পন্দন। লাইট দিয়ে চোখ টেনে চোখে কি যেনো দেখলেন অথাৎ সাধারণভাবে গ্রাম্য ডাক্তারা যা যা করেন সেগুলোই। কিন্তু সমস্তকিছু দেখে নিয়ে তিনি বললেন ওর এখন জ্বর নেই। অর্থাৎ কোনোই তো সমস্যা নেই। তবুও যদি চান দুটো ঘুমের বড়ি দিয়ে যাই আরাম করে দুদিন বেড রেষ্টে থাকুক। কথার এ পর্যায়েই বাহিরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো। কাজেই ডাক্তারের ডাক্তারি কাজ শেষ হলেও তাকে আরো বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে বৃষ্টি থামার জন্য। এর মধ্যেই বড় মামি আর নিশাত এসে প্রেশার মেপে দেখলো। কথায় আছে কাজ নাই তো খই ভাজ,ডাক্তাররা যখন ফ্রি তেই বাড়িতে বসে থাকে তখন সুস্থ্য মানুষের ও মাঝে মাঝে প্রয়োজন পড়ে প্রেশার মাপার নয়তো রক্তশুন্যতা আছে নাকি এটা জানার। জান্নাতি এবার স্মৃতির কানে কানে বললো,
-যে বৃষ্টি শুরু হলো তাতে তো বরপক্ষের লোকেরা মনে হচ্ছে আজ আর আসতে পারবেনা।
নওসিন এ বার ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো। ঋতুকে বড় মামির ঘরে রাখা হয়েছে,গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে হালকা সাজগোজ করানো হচ্ছে। নওসিন তার পাশে বসে ছোট্ট করে বললো,
-তোকে আজ খুব সুন্দর লাগতেছে। দেখিস আজকে তোকে দেখেই ওরা এঙ্গেজমেন্ট করে যাবে।
বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চললো, যদিও সুধু ঋতুকেই দেখতে আসবে তবুও স্মৃতি আর জান্নাতি খুব বারাবাড়ি রকমে সাজ গোজে ব্যাস্ত। দেখে মনে হচ্ছে দুজনে সাজার কম্পিটিশন শুরু করেছে। এর মধ্যেই স্মৃতি বেশ কয়েকবার ড্রেস চেইঞ্জ করেছে। আজ তার কোনো জামা পছন্দ হচ্ছে না। পাত্রপক্ষদের বসানো হবে নওসিনের ঘরে,এ জন্য তাদেরকে বের করে দেওয়া হয়েছে ওঘর থেকে। তারা এখন ছোটমামার ঘরে। নওসিনের ঘরের চাদর সহ দৃষ্টিকটু আসবাব পরিবর্তন করা হয়েছে। খুব সুন্দর করে ঘরটা সাজানো হয়েছে। বৃষ্টি মনে হয় নওসিনের নানুবাড়ির উঠোন পরিষ্কার করার জন্যই এসেছিলো। নওসিনের যে অসুস্থতা তা কয়েক মুহুর্তের জন্য সবাই ভুলে গেছে। ঠিক মাগরিবের নামাজ পর যখন বাড়ির সকলেই ধরে নিয়েছিলো যে আজ আর পাত্রপক্ষরা হয়তো আসবেনা,ঠিক তখনই বাড়ির বাহিরে একটা সাদা মাইক্রো এসে হাজির। বাড়ির অন্দরমহলে প্রায় ছোটাছুটি লেগে গেলো। স্মৃতি আর জান্নাতি একে অপরের দিকে তাকালো। তারা বিশ্ময়ে হতবাক। অদ্ভুত তো! উনারা যে এ সময়ে আসবে এটা নওসিন আপু কি করে জানলো? পাত্রপক্ষরা একে একে সালাম দিয়ে নিজেদের পরিচয় দিলো কে সম্পর্কে পাত্রের কি এসব। পাত্রের সাথে দুজন সুদর্শন পুরুষ এবং পাত্রের এক মামা এসেছেন।
যথারিতি ঋতুকে তাদের সামনে নিয়ে যাওয়া হলো,ঋতুকে দেখা মাত্রই তারা পছন্দ করে ফেললো,এখন পাত্রের মামা একেবারে দিন তারিখ ঠিক করে ফেললো। ঋতুকে আংটি পড়ানো হলো। মনে হচ্ছে তারা এসব প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন। ঋতু ভেতরে ভেতরে খানিকটা অবাক হলো। পরপর কয়েকবার তাকে দেখতে এসে পাত্রপক্ষরা তাকে পছন্দ না করেই ফেরত গেছে। সে ভেবেছিলো আজকেও তেমনটায় হবে তাই আগে থেকেই মানোসিক প্রস্তুতি নিয়ে ছিলো। কিন্তু আজ কেনো এমন ব্যাতিক্রম হলো,নওসিন বলেছিলো জন্যই কি এটা হয়েছে? কে জানে হয়তো হ্যাঁ,নয়তো না। পাত্র পক্ষরা বিদায় নেবার কিছুক্ষনের মধ্যেই পুরো বাড়িটা অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। অর্থাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলো। নিশাত মোম আনতে রান্নাঘরে চলে গেলো। পাশের রুমে নওসিনের পাশে সুমি ছিলো কিন্তু সে ও কি মনে করে নিশাতের সাথে বের হয়ে গেছে। নওসিন তার ঘারের পাশে কার যেনো নিঃশ্বাসের শব্দ পাচ্ছে। মুহুর্তেই তার সারাশরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো। কে যেনো ফিসফিসিয়ে বললো,
-নওসিন…চাঁদনী পসর তোমার জন্য অপেক্ষা করছে…বাহিরে চলো,সে তোমার অপেক্ষায় আছে।
নওসিন সম্মোহনের মতো সেই দমকা বাতাসকে অনুসরণ করতে লাগলো। নওসিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেই বিদ্যুৎ চলে এলো। রান্নাঘর থেকে নিশাত ফিরে এসে লক্ষ্য করলো নওসিন ঘরে নেই। আবারো সবাই চিন্তিত হতে শুরু করলো। কতোদিন চলবে এসব তা তারা নিজেরাও জানেনা। নিশাত,রাজিয়া বেগম আর নওসিনের বড় মামা ছুটে গেলেন নদীর দিকে।
নওসিন আবারো এসে বসেছে জেলেদের সেই টং এ। পাশে লাল পাঞ্জাবি পড়া সেই যুবক। আজ তার কথাগুলো আরো রহস্যময়। নওসিনের মনে অনেক প্রশ্ন জমা হয়ে আছে। গত রাতে সে বলেছিলো নওসিন কারোর জন্য অপেক্ষা করে আছে কিংবা সে নিজে তার কাছে যাবার অপেক্ষা করছে। এসব রহস্যের জট খুলবে কবে?
-কি ব্যাপার মিস নওসিন,আজ এতো চিন্তিত যে! চাঁদনী পসরের চাঁদ ওঠেনি তাই মন খারাপ?? আসলে আজ থেকে চন্দ্রক্ষয় শুরু হবে তাই চাঁদটা একটু দেরিতে উঠবে আর আমার হাতেও আজ বেশি সময় নেই একটু পরেই আমাকে যেতে হবে,আমার হাতে আজ বেশি সময় নেই।
-কেনো? কোথায় যাবেন আপনি?
-অশরীরিরা বেশিক্ষণ কারোর সাথে থাকতে পারেনা। তাদেরকে নির্দিষ্ট একটা সময় পর ফিরে যেতে হয়। আজ পূূণচন্দ্র ওঠার আগেই আমাকে ফিরে যেতে হবে…
-ফালতু ভয় দেখাবেন না,আপনি কি অশরীরি নাকি!
-কেনো তুমি কি ভয় পাচ্ছো?
-আমি খুব বেশি সাহসীও না আবার অল্পতেও ভয় পাইনা। আপনি যে ঠাট্টা করছেন আমি তা বেশ বুঝতে পারছি।
-আমাকে এতোটা কষ্ট দিবেন না মিস নওসিন। আমাকে মুক্তি দিন,অনেকবছর হলো আমি আপনার অপেক্ষায় ছিলাম। নিজের বন্ধন থেকে আমাকে মুক্ত করে দিন।
-বন্ধন? কিসের বন্ধন? আর কিসেরই বা মুক্তি?
-আমাকে এখন ফিরতে হবে,ওরা এক্ষুনি এসে পড়বে…বলতেই ধ্রব এক পা দু পা করে পেছনের দিকে যেতে লাগলো। নওসিন একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে গেলো তারপর হঠাৎই অজ্ঞান হয়ে গেলো। রাজিয়া বেগম আর নিশাত এসে নওসিনকে টং এ অজ্ঞান অবস্থায় পায়। বড় মামা তাকে কাধে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। রাতের মধ্যে নওসিন বেশ কয়েকবার জেগে উঠে পানি খেতে চায়। রাজিয়া বেগম চোখ মুছছেন আর মেয়ের পাশে বসে গুণগুনিয়ে কোরান তিলাওয়াত করছেন। এদিকে পাশের ঘরে স্মৃতি,সুমি,জান্নাতি আর ঋতু গল্প করছিলো। গল্পের এক পর্যায়ে নওসিনের কথা উঠলে তারা ঋতুকে জানায় আশ্চর্যজনক কথা,কেমন করে নওসিন আপু জানলো যে বরপক্ষ মাগরেবের পর আসবে? এ পর্যায়ে ঋতু এবার নিজেই মুখ খুললো,
-শুধু কি তাই? দেখনা যেখানে পাত্রপক্ষরা আমাকে পছন্দ করেনা সেখানে আজকে নওসিন বলার পরেই আমার বিয়েটা ঠিক হয়ে গেলো! তাছাড়াও আরেকটা বড় কথা আছে…
এটুকু বলে ঋতু এবার থামলো। সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে আরেকটু কাছে কাছে এগিয়ে এলো…
-কাল যখন নওসিন দই খেতে চাইছিলো ঠিক তখনই বাহিরে দই ওয়ালা এসে হাজির হয়েছে। আমি কাকতালীয় ভেবে উড়িয়ে দিলেও এখন বুঝতেছি কিছু একটা গন্ডগোল অবশ্যই আছে নওসিনের মাঝে। সব ঘটনাই তো কাকতালীয় ভাবে ঘটছে না।
ব্যাপারটা নওসিনের নানী অবধী যেতে বেশি সময় লাগলো না। উনিও বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। নওসিনের নানা আবার গেলেন ইমাম সাহেবকে ডেকে আনতে। উনি এলেন ফজরের নামাজের পর। এসেই প্রথমে যেটা করলেন তা হলো তার গা থেকে চাঁদর সরিয়ে দিলেন। নওসিনের ডান কোমরে বিরাট একটা ক্ষত, তাতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে,উপস্থিত সকলেরই চক্ষু কপালে উঠেছে। ইমাম সাহেব বললেন,
-মেয়েকে বেশিদিন এভাবে ফেলে রাখা ঠিক হবেনা কিছু একটা করতে হবে নয়তো মেয়েটাকে আর বাঁচানো যাবেনা। আজ থেকে চন্দ্রক্ষয় হতে শুরু করেছে। চন্দ্রের সাথে সাথে তার শরীরও ক্ষয় হতে শুরু করেছে। আস্তে আস্তে সে দুর্বল হয়ে পড়বে। কোনো এক খারাপ তান্ত্রিক কোনো খারাপ জিন দ্বারা তাকে নিজের বসে করে নিয়েছে,তার রুহ নিয়ে ঐ তান্ত্রিক কোনো এক বিশেষ সাধনা করতে চাইছে । এর চেয়ে আর বেশি কিছু বলে সাহায্য করতে পারবোনা আমার প্রাণসংশয়ের আশঙ্কা আছে। এই বলে উনি এক গ্লাস পানিতে দোয়া পড়ে দম করে চলে গেলেন। রাজিয়া বেগম মুহুর্তেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।
সকালবেলায় আগের দিনের চেয়েও বেশ জোরে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে,একটু পর পর বিজলী চমকাচ্ছে। বৃষ্টির তালে রাজিয়া বেগমের চোখ থেকেও ঝরতে লাগলো প্রবল বর্ষণ। প্রকৃতি যেনো তাকে সায় দিতেই বারি বর্ষণ শুরু করেছে। নওসিনের নানী ক্রমাগত দোয়া পড়ে যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে মুনাজাত করছেন। তিনি একটা কথায় বার বার শুনতে পাচ্ছেন কেউ যেনো তাকে বার বার সান্তনা দিচ্ছেন “সৃষ্টি যিনি করেছেন এই জগৎ ও সংসার,বিপদ কিংবা সুখে দুঃখে স্বরণ নিয়ো তার।” তাইতো উনি বার বার আল্লাহর কাছে সাহায্য চাচ্ছেন। নওসিন এখন বিভোর হয়ে ঘুমোচ্ছে। রাজিয়া বেগম শরিষার তেল গরম করে এনে মেয়ের হাতে পায়ে মালিশ করতে লাগলেন।
তিনি বার বার বলে চলেছেন,
-আমি বা আমার মেয়ে অথবা আমার পরিবার তো কোনোদিন কারোর ক্ষতি করিনি তবে কেনো কেউ আমাদের মেয়ের এমন ক্ষতি করার চেষ্টা করছে? আল্লাহর দোহায় লাগি সে কি চায় সামনে এসে বলুক আমরা তাই দিবো বিনিময়ে আমার মেয়ের জীবনটা ফেরত দিক।
রাজিয়া বোগম অজান্তেই একটা দির্ঘশ্বাস ফেললেন।

সাজিদ আর মাহির এই গ্রামেরই ছেলে। তারা কি কারণে আজ বড্ড সকাল সকালেই গেছে নদীতে গোসল করতে। পানিতে নেমে সাতার কাটতে কাটতে তারা মাঝ নদীতে চলে যায়। হঠাৎ তারা খেয়াল করে তাদের থেকে প্রায় ২৫/৩০ হাত দুরে একটা মধ্যবয়সি মহিলা পানির উপরে ধ্যানাসনে বসে চোখ বন্ধ করে কি সব পড়ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি সচ্ছ কাচের উপর বসে আছেন,নয়তো সাধারণ মানুষ কি করে পানির উপরে এমন স্থিরভাবে বসে থাকবে। প্রথমত সাজিদ আর মাহির খুব কৌতুহল নিয়ে সম্মোহনের মতন ব্যাপারটা জানার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের ভয় পাওয়া শুরু হয় মিনিট পাঁচেক পর,যখন ধ্যানাসনে বসা ঐ মহিলার সামনে পানি থেকে উঠে আসে এক বিভৎস লাশ। ধবধবে সাদা কাফনের কাপড়ের একটুকরোও ভেজেনি পানি থেকে উঠে আসার পরেও। তবুও মাহির আর সাজিদ কোনো নড়াচড়া করতে পারছে না। মনে হচ্ছে তারা পাথরের মুর্তির মতো হয়ে গেছে। তাদের শরীর গলাপর্যন্ত ডুবে আছে পানিতে শুধু মাথাটা বের করে রেখেছে,যে কারণে এতোক্ষণেও তান্ত্রিক মহিলাটা তাদেরকে খেয়াল করছে না। তান্ত্রিক মহিলাটি নির্বাক ভঙ্গিতে লাশটার মাথা কেটে যথারিতি লাশের বাকি দেহ পানিতে ডুবিয়ে দিলো। শুধু মাথাটা রইলো তার হাতে আর সেই মাথা থেকে গাঢ় খয়েরি রংয়ের মরা রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়তে লাগলো। এতোক্ষণ মাহির আর সাজিদ চুপ করে থাকলেও এই দৃশ্যটা দেখার পর তাদের আর ধৈর্য্য হলোনা বাকি অংশ দেখার। একটা বিকট চিৎকার করতে করতে খুব দ্রুত সাতরে এপারে ফিরে আসে,তাদের চিৎকারেই সাধনায় ব্যাঘাত ঘটে ঐ তান্ত্রিক মহিলার সঙ্গে সঙ্গেই তার শরীর থেকে কি যেনো খুব দ্রুত নেমে যায় পানিতে আর সাজিদ আর মাহিরকে ধরার চেষ্টা করে। সাজিদ আর মাহির পাড়ে ওঠার মুহুর্তেই কে যেনো তাদের পা আটকে ধরে। প্রাণপন চেষ্টা করে যখন তারা পানি থেকে নিজেদের পা তুলে আনতে সক্ষম হয় ততক্ষণে তাদের পায়ের বেশ খানিকটা কেঁটে গেছে কারোর নখের আচরে। একটু দম নিয়েই তারা হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড় লাগায় বাড়ির দিকে। বাড়ি ফিরেই তারা অজ্ঞান হয়ে পরে। জ্ঞান ফেরে দুপুরের পর। কিন্তু তাদের গায়ে তখন প্রচন্ড জ্বর। গ্রামের বেশ কিছু লোক কিছুক্ষণ পর পর এসে জটলা পাকিয়ে দেখে যাচ্ছেন তাদেরকে। সাজিদ আর মাহিরের মায়েরা এতোক্ষণে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন। যে যার মতো টোটকা বলে যাচ্ছেন সে মতোই তারা জ্বর সারানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পানি ঢালা হচ্ছে সাজিদ আর মাহিরের মাথায়। আছরের নামাজ পর ইমাম সাহেব তাদেরকে দেখতে আসেন। ততক্ষণে সাজিদ মাহির একটু সুস্থ হয়ে উঠেছে। আস্তে আস্তে তারা যা দেখেছে তা হরবরিয়ে ইমাম সাহেবকে জানালেন। ইমাম সাহেব সবটা শুনে কাউকে আর কিছু বললেন না। নিশ্বব্দে বেরিয়ে এলেন তাদের বাড়ি থেকে। কারণ তার ধারণা হচ্ছে মাগরেবের আযানের আগেই তারা দুজন মারা যাবে। আর যতদুর সম্ভব এরা সেই তান্ত্রিক মহিলাকেই দেখেছে যে নওসিনের উপর কালো জাদু করেছেন। নাহ এ দুজনকে তো তিনি বাঁচাতে পারবেন না,অনেক দেরি হয়ে গেছে,কিন্তু চেষ্টা করলেই এখন নওসিনকে বাঁচানো যেতেও পারে। উনি সোজাসুজি বড়বাড়িতে ঢুকলেন। নওসিনের নানার ঘরে গিয়ে কি সব পরামর্শ করে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। সেদিন মাগরেবের নামাজের সাথেই দুইজন কিশোরের মৃত্যুর এহলান ও জারি করা হলো। হ্যাঁ,ইমাম সাহেবের ধারণায় সত্যি হয়েছে। এই তান্ত্রিক কোনো স্বাধারণ তান্ত্রিক বলে মোটেও মনে হচ্ছেনা। খুব বড় কিছু পাবার আশায় সে কঠোর সাধনা করছে। এর সাথে টক্কর দেওয়ার ফল খুব একটা ভালো হবে না। তবুও আল্লাহর চেয়ে তো আর সয়তানি শক্তি বড় হতে পারেনা। তিনি এবার পুরোদমেই লেগে পড়বেন সয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। বার বার তার মনে হতে লাগলো “রোজ আল্লাহ খাদ্য আহার যোগান যাহারে,থাকতে হায়াত কেউ পারেনা মারতে তাহারে” ইমাম সাহেবের জানাশোনায় এক বুযুর্গ রয়েছেন যিনি জ্বীন আহব্বান করার ক্ষমতা রাখেন। তাকে ফোন করে জরুরি ভিত্তিতে ডেকে পাঠালেন ইমাম সাহেব। বেশি দেরি হলে ঐ তান্ত্রিক আরো খানিকটা সময় পেয়ে যাবে নওসিন কে বশ করার। তাকে কোনোভাবেই কোনো সুযোগ দেওয়া চলবেনা।
(চলবে…)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ